আসন্ন গণভোটকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে গণভোটে ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের। তাঁর মতে, প্রস্তাবিত গণভোটটি সংবিধানবিরোধী, বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এটি কার্যকর হলে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে জিএম কাদেরের বক্তব্য
মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জাতীয় পার্টির চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণা উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন জিএম কাদের। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি সাংবিধানিক সরকার হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছে এবং শপথের সময় তারা সংবিধান সংরক্ষণ, সমর্থন ও রক্ষার অঙ্গীকার করেছে। অথচ সেই সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গণভোটের মাধ্যমে আনার কোনো সাংবিধানিক সুযোগ নেই।
সংবিধান সংশোধন নিয়ে আপত্তি
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা শুধুমাত্র নির্বাচিত সংসদের হাতে ন্যস্ত। নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এই ধরনের সংশোধন করতে হয়। সেখানে গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের প্রশ্ন তোলা সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি আরও বলেন, সংবিধানের মতো জটিল ও সংবেদনশীল বিষয় সাধারণ মানুষের সামনে শুধুমাত্র ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’—এই দুই বিকল্পে উপস্থাপন করা বাস্তবসম্মত নয়। বিশেষ করে গ্রাম পর্যায়ের সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি এভাবে তুলে ধরা অযৌক্তিক ও বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
গণভোট প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন
জিএম কাদের এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলে বলেন, যারা এই গণভোটের প্রস্তাব দিয়েছে, তারা আদৌ বিষয়টির গভীরতা ও জটিলতা অনুধাবন করেছে কি না, তা নিয়ে তাঁর সন্দেহ রয়েছে। তাঁর মতে, এমন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে আবেগ বা রাজনৈতিক চাপের পরিবর্তে সংবিধান ও আইন অনুসরণ করাই হওয়া উচিত।
নির্বাচনী মাঠে বাধা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান নির্বাচনী মাঠে তাদের দলীয় প্রার্থীদের সম্মুখীন হওয়া বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কথাও তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, অনেক এলাকায় তাদের প্রার্থীরা ভয়ের কারণে স্বাভাবিকভাবে প্রচারণা চালাতে পারছেন না। অনেক ভোটার প্রকাশ্যে জানিয়েছেন যে তারা জাতীয় পার্টিকে ভোট দিতে চান, কিন্তু তাদেরকেও নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
জিএম কাদের বলেন, ভোট দিলে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হবে—এমন ভয় দেখানো হচ্ছে ভোটারদের। এমনকি মাঠে কাজ করতে গেলে গ্রেপ্তারের আশঙ্কার কথাও পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে শুনতে পাচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।
মনোনয়ন ও রাজনৈতিক চাপে থাকার অভিযোগ
তিনি জানান, ৩০০ আসনের মধ্যে জাতীয় পার্টির ১৯৬ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং আরও দুইটি আবেদন এখনো প্রক্রিয়াধীন। তবে নির্বাচন করতে গিয়ে দলটি নানামুখী চাপ ও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের মতে, এসব পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাদেরকে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের দাবি
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে জিএম কাদের বলেন, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলে একটি সমান ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ—অর্থাৎ ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’—নিশ্চিত করা সম্ভব। তিনি জানান, জাতীয় পার্টির তিনজন প্রার্থী বর্তমানে কারাবন্দি অবস্থায় নির্বাচন করছেন। জামিন পাওয়ার পর আবার নতুন করে মামলা দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এছাড়া আরও অনেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা রয়েছে, যেগুলোর কোনো কোনো ক্ষেত্রে এখনো চার্জশিট পর্যন্ত দাখিল করা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতারা
এই সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীসহ দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তারা দলীয় অবস্থান ও নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
উপসংহার
সার্বিকভাবে গণভোট, সংবিধান সংশোধন এবং আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে জাতীয় পার্টির উদ্বেগ ও আপত্তির বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন জিএম কাদের। তাঁর বক্তব্যে একদিকে যেমন সাংবিধানিক কাঠামো রক্ষার আহ্বান রয়েছে, তেমনি অন্যদিকে নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার দাবি উঠে এসেছে। দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে, তা নির্ভর করবে এসব প্রশ্নের বাস্তবসম্মত ও সাংবিধানিক সমাধানের ওপর।
আরও পড়ুন: রাজনীতি হয়ে উঠছে মানুষের আয়ের উপায়

