সেই ২০১৯ সাল থেকে আমি কক্সবাজার যাই। কারন, ২০১৯ সাল থেকেই আমি ঔষধ কোম্পানীতে যুক্ত। মাঝখানে শুধু ২টি কোম্পানী চেঞ্জ করেছি। একটি কোম্পানীতে ছিলাম ১ মাস এবং তাতেই আমার কক্সবাজার ভ্রমণের সৌভাগ্য হয়েছিল এবং আরেকটি কোম্পানীতে ছিলাম ৮ মাস এবং সেখানেও কক্সবাজার ভ্রমণের সুযোগ হয়েছিল। এরপর থেকে রয়েছি হেল্থকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস-এ এবং এখানে তো প্রতিবছর যাওয়াই হয়।
প্রতিবছরের ন্যায় এবারও আমি কক্সবাজার গেলাম। মনটা তেমন ভালো ছিলো না। বিষাদময় ছিলো। কারন, আমার কাছে পর্যাপ্ত টাকা-পয়সা ছিলো না। যাওয়ার সময় ট্রেনের টিকেট কেটেছিলাম। আর আসার টিকেট কাটা হয়নি।
কক্সবাজার যাওয়ার পর আমাকে পড়তে হয় আরেকটা অস্বস্তিতে। আমার শরীরে রয়েছে এলার্জিজনিত রোগ (চর্মরোগ)। দেখতে খারাপ দেখায়। হঠাৎ রোগটা বেড়ে গিয়েছিল। আমি যে গেঞ্জি পড়ে ঘুরবো কিংবা রুমে স্যান্ডেল গেঞ্জি পড়বো সেই অবস্থা আমার ছিলো না। কারন, হাতগুলোও আক্রান্ত ছিল। আর আমি চাইতাম না এগুলো কেউ দেখুক। তাই সবসময় রুমের মধ্যেও শার্ট পড়ে থাকতাম এবং শার্ট পড়েই ঘুমাতাম।
অবশ্য রুমের আরেক কলিগ (যে আমার সাথে থাকতো) তাতে কোন কিছু মাইন্ড করে নাই। কিন্তু এই বিষয়টা আমাকে সত্যিই অনেকটা অস্বস্তিতে ফেলে রাখছে। মাঝে মাঝে সুস্থ থাকি আবার মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়ে যাই। শরীরের রোগটা এই বাড়ে আবার এই কমে। আমাকে অনেক নিয়ম মেইনটেইন করে চলতে হয়।
যেদিন আমাদের মেইন মিটিং (কনফারেন্স মিটিং) সেদিন মিটিং শেষ হলো দুপুর ২টায়। তখন সেখানে খাবারের ব্যবস্থা আছে। আমার দেখা ৪ বছরের মিটিংয়ের মধ্যে ২০২৫ সালের মিটিং ছিল সবচেয়ে বাজে। কোন ধরণের ঘোষণা নাই এবং আমাদের নিয়ে কোন কথাই বলেনি। কোন ফিউচার প্ল্যান কিংবা সুযোগ-সুবিধার কথা বলেনি। সবার মনটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল।
তো আমি খাবার জন্য লাইনে দাড়ালাম। অনেক মানুষ, প্রায় ৪ হাজার। এতো মানুষ একসাথে খেলে কেমন হট্টগোল হতে পারে চিন্তা করে দেখুন। আমি ২০ মিনিট দাড়িয়ে থাকার পরে দেখি যে অবস্থা তাতে খাবার যেখানে দিচ্ছে সেখানে পৌছতে আমার প্রায় আরও এক কিংবা দেড় ঘন্টা সময় লাগবে। মন মেজাজ খুবই খারাপ। তখন সেখান থেকে বের হয়ে গেলাম এবং পরে একটি হোটেল-এ (ঢাকা কিচেন) ৩৫০ টাকার বিনিময়ে খাওয়া করলাম।
শুধুমাত্র হিমছড়ি ঘুরতে গিয়েছিলাম। সেখানেও যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। কারন, হিমছড়িতে তো আর দেখার মতো কিছু নাই। শুধু কষ্ট করে পাহাড়ের ওপরে ওঠা ছাড়া আর সেখানে আর কিছুই নাই। আমার মার্কেটের কলিগ গেছে আর তাই তার সাথে যাওয়া। উনি তার স্ত্রীকে নিয়ে গেছে এবং আমি সাথে গিয়ে কিছু ছবি তুলে দিয়েছি। আমি আবার ভালো ছবি তুলতে পারি। এই হচ্ছে অবস্থা। অবশ্য আমার নিজের তেমন কোন ছবি তোলা হয়নি।
এভাবে দুই দিন শেষ হলো। এরপর তৃতীয় দিন ১৫০০ টাকা নিয়ে শুটকি কিনলাম। এই ১৫০০ টাকা অন্যজনদের। আমার মার্কেটের রেডিয়েন্ট কোম্পানীর ভাইয়ের ১০০০ আর আমার এক ডাক্তার ম্যাডামের ৫০০। তারা শুটকি আনতে বলেছে। পরে কিনলাম। আর আমার দুই মেয়ের জন্য ৭০০ টাকার কসমেটিক্স কিনলাম এবং স্ত্রীর জন্য ৩০০ টাকার আচার কিনলাম। আমার পকেটে থাকলো মাত্র ৭০ টাকা। আর কোন টাকাই নেই।
বাড়িতে বলেছিলাম কিছু টাকা পাঠাতে আমার বড় ভাইয়ের কাছে। সে দিবে দিবে বলে আমাকে টাকা দিলো মাত্র ১৫০০ এবং সেটাও রাত ৮ টার পরে। আমি সেদিন দুপুরে আর খেতে পারিনি। কারন, আমার কাছে টাকা ছিলো না। পরে আরেক জায়গা (আইরিনের আম্মু) থেকে আমি জরুরী ১০০০ টাকা নিলাম এবং বাইরে গিয়ে ৮০০ টাকা দিয়ে টিকেট কাটলাম। পকেটে থাকলো ২৭০ টাকা। হোটেলে গিয়ে দুটো পরোটা আর ডাল সবজি খেলাম।
ভাত খাওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিলো না। তাছাড়া ভ্রমণের সময় আমি রুটি খাওয়া বেশি পছন্দ করি। এরপর সব গুছিয়ে আমি বাসের উদ্দেশ্যে বের হলাম। যেখানে টিকেট কেটেছি সেখান থেকে বাসে উঠার জায়গা বেশ দূরে। আমি তো এটা জানতাম না। আমি অটো না পেয়ে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি। কিন্তু রাস্তা আর ফুরোয় না। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম যে, কত দূর? উনি বললেন হেটে যেতে অনেক সময় লাগবে। আপনি অটো নেন। কিন্তু অটো পাচ্ছিলাম না।
অনেক দূর যাওয়ার পরে একটা অটো পাই এবং সেটাতে উঠে পড়ি। তখন গাড়িতে চড়ার সময়ও হয়ে গেছে। অটোওয়ালা ভাইটি আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছে। দ্রুত নিয়ে গেছে এবং বাস কাউন্টার চিনিয়ে দিয়েছে। তাকে আমার তরফ থেকে ধন্যবাদ জানাই।
পরে গাড়িতে উঠলাম। সকাল ৬টার দিকে এসে এয়ারপোর্ট পার হয়ে জসিমউদ্দীন এভিনিউ-এ নামলাম। রাস্তায় তেমন কোন সমস্যা হয়নি। নিরাপদেই আসতে পেরেছি। কিন্তু কক্সবাজারের পুরোটা সময়জুড়ে আমার মনের মধ্যে কোন আনন্দ ছিলো না।
এই যে আমার কাছে তেমন কোন টাকা ছিলো না এটার কারন কী? কেন এমন হলো? এতো মন খারাপ করে কেন সময়টা কাটালাম? এগুলোর পেছনে অনেক গল্প রয়েছে। তো কিছুটা শেয়ার না করলে আপনারা বুঝবেন কি করে? তাই আরেকটু মনোযোগ ধরে রাখুন। বাকি কথাগুলো পড়ুন। তাহলে বুঝতে পারবেন। আমাকে হয়তো ভুল বুঝবেন না।
সবকিছুর মূলে হলো অভাব। অভাব যেন আমাকে ঘিরে ধরেছে। আপনারা হয়তো অনেকেই জানেন যে, ওষুধ কোম্পানীগুলো খুব ভালো বেতন দেয়। কিন্তু জানেন না যে, টাকাগুলো তাহলে কোথায় যায়! আজ সেটারই কিছুটা ধারণা দেই।
ধরুন, আমি চল্লিশ হাজার টাকা স্যালারী পাই। তাহলে আমাদের তিনজনের সংসার চলার পরেও আরও অনেক টাকা বাঁচার কথা। আমাদের সেভিংস করার কথা। কিন্তু মার্কেটে অনেক লস আছে। বাজেট পূরণ করতে গিয়ে অনেক পরিমাণ ওষুধ আন্ডার রেটে (কোম্পানীর বিক্রি করা দামের চেয়ে আরও কম দামে বিক্রি করা) বিক্রি করতে হয়। এতে অনেক লস হয়। ধরে নেন, কোন কোন মাসে কারনবশতঃ পনের থেকে বিশ হাজার টাকাও লস হয়ে যায়। আর মিনিমাম তো পাঁচ থেকে ৮ হাজার টাকা লস হয়-ই প্রতিমাসে।
মার্কেটে নিজের ব্যক্তিগত খরচ চলে যায় পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা। আবার অনেক কেমিস্ট বিল দিতে না পারলে তাদের চালিয়ে দিতে হয়। অর্থাৎ নির্ধারিত পরিমাণ টাকা আমি দোকানদারকে দিলাম; কিন্তু সেই টাকা কবে হাতে পাবো সেটার কোন গ্যারান্টি নাই। একসাথে পাওয়া তো প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। বলবো না যে সব কেমিস্ট খারাপ। তবে গুটিকয়েক বাদে সবাই খারাপ শ্রেণির মধ্যেই পড়ে বিশেষ করে লেনদেনের ক্ষেত্রে।
তো মূলত ঘটনা এই। বিস্তারিত বলতে গেলে বহু লিখতে হবে। তবুও শেষ হবে না। বাইরে থেকে আমাকে সবসময় অফিসার দেখা গেলেও ভেতরে ভেতরে আমার অনেক ক্ষয় হয়ে গেছে। টেনশন করতে করতে মাথায় তো টাক পড়ে গেছে। আমি জানি, আমার জীবনে কি হয়েছে – কি হবে। তবুও আশা ছাড়িনি, বাকিটা আল্লাহ ভরসা।
আরও পড়ুন: রাজনীতি হয়ে উঠছে মানুষের আয়ের উপায়


