Azgar Ali

ইসলামের আগে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সভ্যতায় রোজা রাখার সংস্কৃতি

ইসলামের আগে রোজা

রমজান মাসে মুসলমানরা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও কামাচার থেকে বিরত থেকে রোজা পালন করেন। ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি হলো এই রোজা। তবে ইতিহাস বলছে, ইসলামের আবির্ভাবের বহু আগেই মধ্যপ্রাচ্য ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বিভিন্ন সভ্যতা ও ধর্মে উপবাস বা রোজার ধারণা প্রচলিত ছিল।

BBC Arabic–এর একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আত্মশুদ্ধি, দেবতাদের সন্তুষ্টি এবং ধর্মীয় আনুগত্য প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে প্রাচীন সভ্যতাগুলোতে উপবাস একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন ছিল।

প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় উপবাসের প্রচলন

প্রাচীন মিশর সভ্যতা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও দেবদেবী পূজার জন্য সুপরিচিত। প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করত, দেবতাদের নৈকট্য লাভ এবং তাদের অসন্তোষ এড়াতে দেহ ও আত্মাকে শুদ্ধ রাখা জরুরি। এই বিশ্বাস থেকেই উপবাস তাদের ধর্মীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে।

ইতিহাসবিদদের মতে, বসন্ত উৎসব, ফসল উৎসব এবং নীলনদের বার্ষিক প্লাবন উপলক্ষে প্রাচীন মিশরীয়রা বিভিন্ন আচার পালন করত, যার মধ্যে উপবাস অন্যতম। তাদের ধারণা ছিল, উপবাসের মাধ্যমে আত্মা পাপ ও ত্রুটি থেকে মুক্ত হয়।

তবে উপবাস কারা পালন করত—এ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, এটি শুধুমাত্র পুরোহিত শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আবার অন্য গবেষকদের মতে, নির্দিষ্ট সময়ে সাধারণ জনগণও উপবাস পালন করত।

কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রাচীন মিশরে উপবাস সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলত। উপবাসের মেয়াদ কখনো তিন দিন, আবার বিশেষ ক্ষেত্রে ৭০ দিন পর্যন্ত হতে পারত। এ সময় খাদ্য, পানীয় এবং যৌন সম্পর্ক থেকে বিরত থাকার বিধান ছিল।
এছাড়া মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তি কামনায়ও উপবাস পালনের রীতি ছিল। কিছু ক্ষেত্রে ৭০ দিন ধরে শুধু শাকসবজি ও পানি গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হতো।

তবে গবেষকদের একটি অংশ মনে করেন, আসমানি কিতাবভিত্তিক ধর্মগুলোর রোজার সঙ্গে প্রাচীন মিশরীয় উপবাসের সরাসরি কোনো ধর্মীয় যোগসূত্র নেই।

জরথুস্ত্রবাদে আত্মসংযম ও উপবাস

খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার বছরেরও বেশি আগে প্রাচীন পারস্য ও আশপাশের অঞ্চলে জরথুস্ত্রবাদ প্রচলিত ছিল। জরথুস্ত্র নামে এক ধর্মপ্রচারকের শিক্ষা থেকে এই ধর্মের সূচনা হয়। এক সময় এটি পারস্য সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত ছিল।

জরথুস্ত্রবাদে আত্মশুদ্ধি, সত্যবাদিতা ও নৈতিক শৃঙ্খলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। যদিও ইসলামি রোজার মতো এক মাসব্যাপী নির্দিষ্ট উপবাসের বিধান এখানে নেই, তবে নির্দিষ্ট সময়ে খাদ্য গ্রহণে সংযম ও ভোগবিলাস থেকে বিরত থাকার শিক্ষা ছিল।

ধর্মবিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংযম মানুষকে আত্মিকভাবে শক্তিশালী করে এবং স্রষ্টার প্রতি দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে—যা উপবাসের মূল দর্শনের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

ইয়াজিদি ধর্মে উপবাসের রীতি

মধ্যপ্রাচ্যের কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলে প্রচলিত ইয়াজিদি ধর্মেও উপবাসের রীতি রয়েছে। ইয়াজিদি সম্প্রদায় নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় দিবসে উপবাস পালন করে থাকে। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, উপবাস মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি আনুগত্য বাড়ায়।

ইয়াজিদি উপবাস সাধারণত নির্দিষ্ট দিনের জন্য পালন করা হয় এবং এটি ধর্মীয় উৎসব ও আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। গবেষকদের মতে, এখানেও উপবাসের উদ্দেশ্য আত্মসংযম ও আধ্যাত্মিক উন্নতি।

ইতিহাসের আলোকে রোজার ধারণা

ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিভিন্ন সভ্যতা ও ধর্মে উপবাসের পদ্ধতি ও সময়কাল ভিন্ন হলেও মূল উদ্দেশ্য প্রায় একই—আত্মশুদ্ধি, আত্মসংযম এবং স্রষ্টার নৈকট্য লাভ। মানুষের ভোগবাসনা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আত্মাকে শক্তিশালী করার ধারণাটি প্রায় সব প্রাচীন ধর্মীয় সংস্কৃতিতেই বিদ্যমান ছিল।

ইসলামে রোজা এই প্রাচীন ধারণাগুলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ, সুস্পষ্ট ও শৃঙ্খলাবদ্ধ রূপ দিয়েছে। নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট নিয়ম এবং আল্লাহর সরাসরি নির্দেশনার মাধ্যমে রোজা মুসলমানদের জন্য ফরজ ইবাদতে পরিণত হয়েছে।

উপসংহার

ইসলামের আগে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সভ্যতায় উপবাসের প্রচলন থাকলেও ইসলামি রোজার সঙ্গে এসব উপবাসের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। প্রাচীন সভ্যতাগুলোর উপবাস ছিল ধর্মীয় অনুসন্ধান ও আচারভিত্তিক, আর ইসলামের রোজা হলো আল্লাহ নির্ধারিত একটি পরিপূর্ণ ইবাদত।

তবে ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, রোজা বা উপবাস কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়—এটি মানবসভ্যতার এক গভীর আত্মিক অনুশীলন, যা যুগে যুগে মানুষের বিশ্বাস ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে।

আরও পড়ুন: ডিপ্রেশন কমানোর কিছু সর্বোত্তম উপায়

Leave a Reply

Scroll to Top