পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার সীমান্ত উত্তেজনা এবার সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে আফগান তালেবানদের লক্ষ্য করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ‘অপারেশন গাজাব লিল-হক’ নামে একটি সামরিক অভিযান শুরু করে। এর পাল্টা জবাবে সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে হামলার দাবি করেছে তালেবান কর্তৃপক্ষ।
উভয় পক্ষই বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির দাবি করলেও স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কোনো সূত্র থেকে এখনো এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
পাকিস্তানের দাবি: শতাধিক তালেবান সদস্য নিহত
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার এক বিবৃতিতে জানান, অভিযানে অন্তত ১৩৩ জন আফগান তালেবান সদস্য নিহত এবং ২০০ জনের বেশি আহত হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কাবুল, পাকতিয়া ও কান্দাহার অঞ্চলে তালেবানদের একাধিক প্রতিরক্ষা ও সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানা হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, তালেবান সরকারের ২৭টি সীমান্ত ও সামরিক পোস্ট ধ্বংস করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত ৯টি পোস্ট দখলে নেওয়া হয়েছে। অভিযানে দুইটি কর্পস সদর দপ্তর, তিনটি ব্রিগেড সদর দপ্তর, একাধিক ব্যাটালিয়ন ও সেক্টর সদর দপ্তরসহ গোলাবারুদ ডিপো ও লজিস্টিক বেস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানানো হয়।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পিটিভি নিউজ জানায়, পাকিস্তান বিমান বাহিনী কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়ায় তালেবানদের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় নির্ভুল বিমান হামলা চালিয়েছে।
আফগানিস্তানের পাল্টা বক্তব্য
অন্যদিকে আফগানিস্তানের জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ডুরান্ড লাইন বরাবর পরিচালিত প্রতিশোধমূলক অভিযানে ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২৬ ফেব্রুয়ারি রাত ৮টায় পাকিস্তানি বাহিনীর সীমান্ত লঙ্ঘনের জবাবে এই অভিযান শুরু করা হয়।
প্রকাশ্য যুদ্ধের পথে দুই দেশ
সীমান্তে লাগাতার হামলা ও পাল্টা হামলার মধ্য দিয়ে পাকিস্তান কার্যত আফগানিস্তানের সঙ্গে প্রকাশ্য যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘোষণা করেছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। কাবুল ও কান্দাহারসহ একাধিক এলাকায় পাকিস্তানি সামরিক তৎপরতার খবর পাওয়া গেছে, যা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও অবনতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
২০২৬ সালের সামরিক শক্তির তুলনামূলক বিশ্লেষণ
২০২৬ সালের বৈশ্বিক সামরিক শক্তিমত্তা সূচক অনুযায়ী, Pakistan রয়েছে ১৪৫ দেশের মধ্যে ১৪তম স্থানে, যেখানে Afghanistan রয়েছে ১২১তম অবস্থানে।
পাওয়ার ইনডেক্স স্কোরেও বড় ব্যবধান লক্ষ্য করা যায়। পাকিস্তানের স্কোর ০.২৬২৬, আর আফগানিস্তানের ২.৭৩৪২—যেখানে কম স্কোর মানেই বেশি শক্তিশালী সামরিক অবস্থান।
জনবল ও প্রতিরক্ষা বাজেট
পাকিস্তানের জনসংখ্যা প্রায় ২৫ কোটির বেশি, বিপরীতে আফগানিস্তানের প্রায় ৪ কোটি। সক্রিয় সামরিক সদস্য পাকিস্তানের প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার, আফগানিস্তানে মাত্র ৭৫ হাজার। পাকিস্তানের রয়েছে বিশাল রিজার্ভ ও আধাসামরিক বাহিনী, যা আফগানিস্তানের তুলনায় বহু গুণ শক্তিশালী।
প্রতিরক্ষা বাজেটেও ব্যবধান স্পষ্ট—পাকিস্তান বছরে প্রায় ৯.১ বিলিয়ন ডলার, আর আফগানিস্তানের বাজেট মাত্র ১৪৫ মিলিয়ন ডলার।
বিমান, নৌ ও স্থল শক্তিতে ব্যবধান
পাকিস্তানের হাতে রয়েছে প্রায় ১,৪০০ সামরিক বিমান, শতাধিক ফাইটার জেট ও হেলিকপ্টার। বিপরীতে আফগানিস্তানের কার্যকর যুদ্ধবিমান কার্যত নেই। ট্যাংক, আর্টিলারি ও সাঁজোয়া যানেও পাকিস্তান বহুগুণে এগিয়ে।
নৌ শক্তির ক্ষেত্রে আফগানিস্তান সম্পূর্ণ পিছিয়ে, কারণ দেশটি স্থলবেষ্টিত। অন্যদিকে পাকিস্তানের নৌবহরে রয়েছে সাবমেরিন ও আধুনিক যুদ্ধজাহাজসহ প্রায় ১২০টি নৌযান।
সার্বিক চিত্র
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও অবকাঠামোগত শক্তিতে পাকিস্তান আফগানিস্তানের তুলনায় অনেক বেশি সুসংগঠিত ও শক্ত অবস্থানে রয়েছে। তবে সীমান্ত সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।
আরও পড়ুন: ইসলামের আগে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সভ্যতায় রোজা রাখার সংস্কৃতি


