ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিলেন সাবেক সংসদ স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। দীর্ঘ আত্মগোপন শেষে অবশেষে ডিবির জালে ধরা পড়লেন তিনি। মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর ধানমণ্ডির একটি গোপন আস্তানা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর লালবাগ থানায় দায়ের করা একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালত দুই পক্ষের শুনানি শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
যেভাবে ধরা পড়লেন তিনি
ডিবি পুলিশের একটি বিশেষ দল মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ধানমণ্ডির ৮/এ সড়কের একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে শিরীন শারমিনকে হেফাজতে নেয়। ৫ই আগস্টের পর থেকে তার অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক ধোঁয়াশা ছিল। মাঝখানে তার পাসপোর্ট ইস্যু করার বিষয়টি সামনে এলে তোলপাড় শুরু হয়। তবে ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সহিংসতার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ৬টি মামলা রয়েছে। বর্তমান মামলাটিতে তিনি ৩ নম্বর আসামী।
মামলার বিবরণ ও অভিযোগ
লালবাগ থানার এই মামলার বাদী মো. আশরাফুল (ফাহিম) নামে এক শিক্ষার্থী। তার অভিযোগ, গত ১৮ই জুলাই আজিমপুর সরকারি কলোনি এলাকায় শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে শেখ হাসিনার নির্দেশে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে আশরাফুল গুরুতর আহত হন। মামলায় শিরীন শারমিনের পাশাপাশি শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদেরসহ ১৩০ জনকে আসামী করা হয়েছে।
আদালত কক্ষের চিত্র: ২০ মিনিটের উত্তপ্ত শুনানি
দুপুর ২টার দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সাবেক স্পিকারকে এজলাসে তোলা হয়। এসময় তাকে বেশ বিমর্ষ ও নিশ্চুপ দেখাচ্ছিল। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তাকে ‘ফ্যাসিস্টের সহযোগী’ হিসেবে উল্লেখ করে ২ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানান।
শিরীন শারমিনের মৌন প্রতিক্রিয়া: রাষ্ট্রপক্ষ যখন তাকে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী হিসেবে দাবি করছিল, তখন তিনি নিঃশব্দে মাথা নেড়ে তা অস্বীকার করেন।
বিবাদী পক্ষের যুক্তি: তার আইনজীবীরা দাবি করেন, শিরীন শারমিন একজন নারী এবং ব্যক্তিগতভাবে পরিচ্ছন্ন ইমেজের মানুষ। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন। স্পিকার হিসেবে তার নিরপেক্ষ ভূমিকার কথা মনে করিয়ে দিয়ে জামিন চাওয়া হয়।
আদালতের বারান্দায় বিশৃঙ্খলা ও স্লোগান
শুনানি শেষে তাকে যখন হাজতখানায় ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছিল, তখন আদালত প্রাঙ্গণে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা হঠাৎ ‘জয় বাংলা’ এবং শিরীন শারমিনের সমর্থনে স্লোগান দিতে শুরু করেন। এসময় ভিড় ও ধাক্কাধাক্কির মধ্যে সিএমএম কোর্টের সিঁড়িতে পড়ে গিয়ে আঘাত পান সাবেক এই স্পিকার। পুলিশ সদস্যরা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে নিয়ে যান।
শিরীন শারমিন চৌধুরী ২০১৩ সাল থেকে টানা তিন মেয়াদে বাংলাদেশের প্রথম নারী স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে তার এই পতন ও গ্রেফতার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্য সংকট: ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের সাম্প্রতিক আপডেট


