মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ভয়াবহ অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল-এর যৌথ সামরিক অভিযানে ইরান আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে চালানো এই আক্রমণের পর পুরো অঞ্চল কার্যত সংঘাতের আগুনে জ্বলছে। দীর্ঘদিনের চাপা উত্তেজনা এবার সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে।
ইরানে হামলার পর তেহরানও পাল্টা জবাব দিতে শুরু করেছে। একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করা হচ্ছে ইসরাইলি ভূখণ্ড এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে। এতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটছে।
‘অপারেশন এপিক ফিউরি’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সামরিক অভিযানের নাম দিয়েছেন ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। হোয়াইট হাউসের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি একটি “ব্যাপক ও কৌশলগত অভিযান”, যার আওতায় ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও অবকাঠামোগত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে।
এই অভিযানের ফলে ইতোমধ্যেই ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা।
প্রাণহানির চিত্র
ইরানি রেড ক্রিসেন্টের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত ইরানে নিহতের সংখ্যা অন্তত ৭৮৭ জন। আহত হয়েছেন আরও হাজারের বেশি মানুষ। অপরদিকে, ইরানের পাল্টা হামলায় ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত এবং অন্তত ১৮ জন আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে পেন্টাগন।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ জানান, একটি শত্রু প্রজেক্টাইল মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে একটি সুরক্ষিত সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে ধারণা করা হচ্ছে, ঘটনাটি কুয়েতে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ঘটেছে।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মিনাবে। সেখানে একটি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে হামলায় অন্তত ১৬৫ জন শিশু নিহত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র কি সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে?
আইনগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসের। তবে প্রেসিডেন্ট ‘কমান্ডার-ইন-চিফ’ হিসেবে তাৎক্ষণিক হুমকি মোকাবিলায় সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারেন।
হ্যামলাইন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডেভিড শুল্টজ বলেন, আধুনিক মার্কিন ইতিহাসে অধিকাংশ বড় সংঘাতই আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই সংঘটিত হয়েছে। ভিয়েতনাম ও ইরাক তার উদাহরণ।
১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোলিউশন’ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কংগ্রেসকে অবহিত করতে হয় এবং ৬০ দিনের বেশি একতরফা সামরিক অভিযান চালানো যায় না। ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, তারা কংগ্রেসকে এই হামলার বিষয়ে অবহিত করেছে।
তবে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা অভিযোগ তুলেছেন—এই অভিযান সংবিধান ও আইন লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে।
হামলা না যুদ্ধ—সীমারেখা কোথায়?
ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার অধ্যাপক পল কোয়ার্ক মনে করেন, সংঘাতের সময়কালই মূল পার্থক্য তৈরি করে। তার ভাষায়, “কয়েক দিনের হলে একে হামলা বলা যায়, কিন্তু সপ্তাহ বা মাস পেরোলে সেটিই যুদ্ধ।”
বর্তমান পরিস্থিতি সেই দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের দিকেই এগোচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
পারমাণবিক কর্মসূচি ইস্যু
ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দাবি করেছেন, অভিযানের মূল লক্ষ্য ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। ট্রাম্পের ভাষায়, “ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা চিরতরে ধ্বংস করাই আমাদের উদ্দেশ্য।”
তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) জানিয়েছে, ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির কোনো প্রমাণ তারা পায়নি।
আগাম প্রতিরক্ষা নাকি উসকানি?
ওয়াশিংটনের দাবি, সম্ভাব্য ইরানি হামলা ঠেকাতেই তারা আগাম পদক্ষেপ নিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইসরাইল নিজেই ইরানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
তবে ট্রাম্প নিজেই এক বক্তব্যে বলেন, তিনি ধারণা করেছিলেন ইরান আগে হামলা চালাতে পারে, তাই যুক্তরাষ্ট্র আগে আঘাত হেনেছে। স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো ক্রিস্টোফার প্রিবল বলেন, প্রশাসনের বক্তব্যে স্পষ্টতা নেই এবং লক্ষ্য নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
শাসন পরিবর্তনের ইঙ্গিত
ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানি জনগণকে তাদের সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এতে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই অভিযানের আড়ালে ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর ইঙ্গিতও রয়েছে।
স্থলসেনা পাঠানো হবে কি?
এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কেবল বিমান ও নৌবাহিনীর ওপর নির্ভর করছে। তবে স্থলসেনা পাঠানোর সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি ট্রাম্প। তিনি বলেন, “প্রয়োজনে সব বিকল্পই খোলা।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বিমান হামলায় ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা অসম্ভব। প্রিবলের ভাষায়, “আপনি একটি দেশের জ্ঞান ও সক্ষমতা বোমা ফেলে মুছে ফেলতে পারবেন না।”
ইরাকের চেয়েও কঠিন চ্যালেঞ্জ
ইরান ভৌগোলিক ও জনসংখ্যাগতভাবে ইরাকের চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বড়। ২০০৩ সালে ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতন ঘটানো তুলনামূলক সহজ হলেও দেশটি স্থিতিশীল রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে বছরের পর বছর লড়তে হয়েছে এবং এক সময় ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন করতে হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে স্থল অভিযান শুরু হলে তা হবে আরও ব্যয়বহুল, দীর্ঘস্থায়ী এবং ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের কারণ।
অভিযান কতদিন চলতে পারে?
এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তিনটি বিষয়ের ওপর—সামরিক সক্ষমতা, অর্থায়ন এবং রাজনৈতিক সমর্থন। কংগ্রেস চাইলে অর্থ বরাদ্দ বন্ধ করে অভিযান থামাতে পারে।
তাছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র, নির্ভুল অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টরের মজুত সীমিত। দ্রুত উৎপাদন না হলে একসময় এই যুদ্ধ পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে উঠবে।
আরও পড়ুন: পাকিস্তান–আফগানিস্তান সংঘর্ষে দুই পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি ও সামরিক শক্তির বাস্তব চিত্র


