১১ মাসের কারাজীবন শেষে মুক্ত অভিনেতা সিদ্দিক — জেলে বসেই লিখেছেন ১৫টি নাটক ও ৩টি সিনেমার গল্প

অভিনেতা সিদ্দিকুর রহমান কারামুক্ত

দীর্ঘ প্রায় ১১ মাসের কারাবাসের পর অবশেষে মুক্তির আলো দেখলেন বাংলাদেশের ছোটপর্দার পরিচিত মুখ অভিনেতা সিদ্দিকুর রহমান। শুধু কারামুক্তিই নয়, এই দীর্ঘ সময়ে তিনি নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন — ধর্মীয় অনুভূতিতে সমৃদ্ধ হয়েছেন এবং সৃজনশীল কাজেও পিছিয়ে থাকেননি।

গ্রেপ্তার ও মামলার পটভূমি

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন উত্তাল, ঠিক সেই সময় রাজধানীর গুলশান এলাকায় সংঘটিত একটি হত্যা মামলায় জড়িয়ে পড়েন সিদ্দিকুর রহমান। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সুবাস্তু টাওয়ারের সামনে আন্দোলন চলাকালীন সময়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক ব্যক্তি প্রাণ হারান। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ ১০ মাস ২২ দিন কারাগারের চার দেওয়ালের মধ্যে কাটিয়ে চলতি বছরের ১৮ মার্চ তিনি মুক্তি লাভ করেন।

রাজনীতির পথে হাঁটা এক শিল্পীর গল্প

একসময় টেলিভিশনের পর্দায় নিয়মিত অভিনয়ে সক্রিয় ছিলেন সিদ্দিকুর রহমান। তবে অভিনয়ের পাশাপাশি রাজনীতির প্রতিও তার আকর্ষণ তৈরি হয়। টাঙ্গাইল ও ঢাকা — উভয় আসন থেকে একাধিকবার নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন পেতে চেষ্টা করেছিলেন তিনি, তবে প্রতিবারই সেই স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এক ঘূর্ণিতে পড়ে কারাগারমুখী হতে হয় এই অভিনেতাকে।

কারাগারে যেভাবে কাটল দিনগুলো

মুক্তির পর নিজেই সামাজিক মাধ্যমে মুখ খুলেছেন সিদ্দিক। তিনি জানান, মুক্তির পর ভিন্ন এক অনুভূতি কাজ করছে, যা কেবল অনুভব করা যায়, ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এতদিন বিষয়টি প্রকাশ না করার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, নিজের মতো করে সময় কাটাতে চেয়েছিলেন।

জেলজীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন —

“আসলে জেলে প্রচুর চিন্তা করার সময় পাওয়া যায়। আমি ভাবলাম, আমি একজন শিল্পী মানুষ — এই সময়টাকে কাজে লাগাই।”

আধ্যাত্মিক রূপান্তর — কোরআন থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ

কারাগারের নিঃসঙ্গ দিনগুলো সিদ্দিকের জীবনে এক গভীর আধ্যাত্মিক পরিবর্তন এনেছে। তিনি স্বীকার করেন, আগে ধর্মীয় কাজে তেমন মনোযোগ ছিল না। কিন্তু কারাগারে গিয়ে কোরআন হাতে তুলে নেন এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত পড়া শুরু করেন।

তার ভাষায়, “আল্লাহই আমাকে পরিবর্তন করিয়েছেন। জেলে কোরআন ধরলাম, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া শুরু করলাম। সেখান থেকে ধীরে ধীরে আমার মধ্যে পরিবর্তন আসে।”

দেওয়ালের একটি লাইন যা মনে গেঁথে গেছে

জেলের দেওয়ালে লেখা একটি ছোট্ট বাক্য তার মনে গভীর রেখাপাত করেছে। সেই লাইনটি হলো — “রাখিব নিরাপদ দেখাবো আলোর পথ”

সিদ্দিক বলেন, “তারা যেহেতু জেলে নিরাপদে রাখবে বলে কথা দিয়েছিল, তাই আমি নিজেই সেই আলোর পথ খুঁজে নিয়েছি।” এই ছোট্ট বাক্যটিই তাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়েছে বলে জানান তিনি।

জেলে বসেই রচনা করলেন ১৮টি গল্প ও একটি বই!

অভিনয়শিল্পী হিসেবে সিদ্দিকের সৃজনশীলতা কারাগারেও থেমে থাকেনি। অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে তিনি জেলে বসেই লিখে ফেলেছেন ১৫টি নাটক ও ৩টি সিনেমার গল্প। পাশাপাশি নিজের জীবন ও অভিজ্ঞতা নিয়ে রচনা করেছেন একটি পূর্ণাঙ্গ বই। কারাগারের অন্ধকার ঘরকে তিনি পরিণত করেছেন সৃষ্টিশীলতার এক নীরব কর্মশালায়।

শারীরিক ও মানসিক ট্রমা এখনো কাটেনি

মুক্তির পরও পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি সিদ্দিক। তিনি জানিয়েছেন, কারাগারের সেই দিনগুলোর ট্রমা এখনো তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। শারীরিক ও মানসিকভাবে আগের রুটিনে ফেরার চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি। তার নামে এখনো দুটি সক্রিয় মামলা রয়েছে, ফলে আইনি লড়াইও অব্যাহত রয়েছে।

সামনে কী আসছে?

জেলে লেখা নাটক, সিনেমার গল্প এবং আত্মজীবনীমূলক বই নিয়ে সিদ্দিকুর রহমান শীঘ্রই নতুনভাবে শিল্পাঙ্গনে ফিরে আসার ইচ্ছা রাখেন। একজন অভিনেতার জন্য যে কারাগার ছিল শাস্তির জায়গা, সেটিই তার কাছে হয়ে উঠেছে নতুন জীবনের সূচনার মঞ্চ।

সিদ্দিকুর রহমানের এই যাত্রা — পর্দার অভিনেতা থেকে কারাবন্দী, কারাবন্দী থেকে আধ্যাত্মিক ও সৃজনশীল মানুষে রূপান্তর — সত্যিই এক অসাধারণ মানবিক গল্প।

আরও পড়ুন: বাবার গ্রেপ্তারে মুখ খুললেন পূজা চেরি: “আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top