জ্বালানি সংকটের শঙ্কা: যানবাহনে তেল বিক্রির সীমা নির্ধারণ করল বিপিসি

যানবাহনে জ্বালানি তেলের সীমা নির্ধারণ

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলার প্রভাবে দেশে তেলের সংকট হতে পারে—এমন গুজবে সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং মজুতদারি রুখতে পেট্রল পাম্পগুলো থেকে তেল বিক্রির সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)

শুক্রবার (৬ মার্চ, ২০২৬) এক জরুরি নির্দেশনায় বিপিসি জানায়, তেলের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এখন থেকে বিভিন্ন শ্রেণির যানবাহনের জন্য দৈনিক নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি বরাদ্দ করা হয়েছে।

কোন যানবাহনে কতটুকু তেল মিলবে?

বিপিসির নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, যানবাহনের ধরনভেদে তেলের সীমা নিম্নরূপ:

যানবাহনের ধরন জ্বালানির ধরন দৈনিক সর্বোচ্চ সীমা
মোটরসাইকেল পেট্রল/অকটেন ২ লিটার
ব্যক্তিগত গাড়ি (কার) পেট্রল/অকটেন ১০ লিটার
এসইউভি (জিপ) ও মাইক্রোবাস ডিজেল/অকটেন ২০ – ২৫ লিটার
পিকআপ ও লোকাল বাস ডিজেল ৭০ – ৮০ লিটার
দূরপাল্লার বাস ও ট্রাক ডিজেল ২০০ – ২২০ লিটার

রসিদ ছাড়া মিলবে না জ্বালানি

এখন থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল কেনার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। প্রত্যেক গ্রাহককে তেলের পরিমাণ ও দামসহ বাধ্যতামূলক রসিদ সংগ্রহ করতে হবে। পরবর্তী সময়ে তেল নিতে এলে আগের সেই রসিদ প্রদর্শন করতে হবে। বিপিসি জানিয়েছে, ডিলাররা গ্রাহকের আগের ক্রয়ের তথ্য যাচাই করে তবেই নতুন করে তেল সরবরাহ করবেন। কোনো অবস্থাতেই নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত তেল বিক্রি করা যাবে না।

সংকটের নেপথ্যে ‘প্যানিক বায়িং’ ও গুজব

বিপিসি সূত্রমতে, বাংলাদেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ অবরুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার নেতিবাচক খবর ছড়ানো হচ্ছে। ফলে সাধারণ গ্রাহক ও ডিলারদের মধ্যে অননুমোদিতভাবে তেল মজুত করার প্রবণতা বা ‘প্যানিক বায়িং’ দেখা দিচ্ছে। বিপিসি স্পষ্ট করেছে যে, দেশে আমদানির সূচি নির্ধারিত রয়েছে এবং নিয়মিত বিরতিতে তেলের চালান আসছে। পর্যাপ্ত ‘বাফার স্টক’ গড়ে তোলার কাজও প্রক্রিয়াধীন।

রাজধানীর চিত্র: দীর্ঘ সারি ও ভোগান্তি

নির্দেশনা জারির পর আজ ছুটির দিনেও রাজধানীর পাম্পগুলোতে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। পরিবাগ থেকে শাহবাগ পর্যন্ত দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে শত শত মোটরসাইকেল ও গাড়ি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে গিয়ে চালকদের মধ্যে হাতাহাতি ও বচসার ঘটনাও ঘটেছে।

উবার চালক নাজমুল হাসান জানান, প্রায় ৫০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি তেল পেয়েছেন। তিনি বলেন, “আমাদের মতো পেশাদার চালকদের প্রতিদিনের উপার্জনের বড় অংশই তেলের ওপর নির্ভরশীল। অথচ এই দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে আমরা নিয়মিত ট্রিপ মিস করছি।”

আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার কোনো তাৎক্ষণিক ঝুঁকি নেই। জনগণকে আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল কিনে কৃত্রিম সংকট তৈরি না করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃ্ঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত তদারকি চালিয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধ: মির্জা আব্বাসের কাছে হাসনাত আবদুল্লাহর নিঃশর্ত ক্ষমা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top