বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব: মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় গ্রাহক ভাগ্য

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং ক্রমবর্ধমান আমদানি ব্যয়ের চাপে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। এই বিশাল আর্থিক চাপ সামলাতে সরকার বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা—উভয় পর্যায়েই দাম সমন্বয়ের জোর তৎপরতা শুরু করেছে। মূলত ভর্তুকির বোঝা কমাতে এবং বিদ্যুৎ খাতের লোকসান নিয়ন্ত্রণে আনতেই এই সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির পথে হাঁটছে বিদ্যুৎ বিভাগ

উচ্চপর্যায়ের কমিটি এবং দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবনা

বিদ্যুতের দাম কতটুকু এবং কীভাবে বাড়ানো হবে, তা পর্যালোচনার জন্য ইতিমধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।

বিদ্যুৎ বিভাগের অভ্যন্তরীণ সূত্র অনুসারে, আবাসিক গ্রাহকদের ওপর বড় প্রভাব পড়তে যাচ্ছে। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে:

  • আবাসিক গ্রাহক: ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

  • লাইফলাইন গ্রাহক: যারা সর্বনিম্ন বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন (লাইফলাইন গ্রাহক), তাদের এই দাম বৃদ্ধির আওতার বাইরে রাখার কথা ভাবা হচ্ছে।

  • প্রক্রিয়া: মন্ত্রিসভার সবুজ সংকেত পেলে এই প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিক শুনানির জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) পাঠানো হবে।

কেন এই মূল্যবৃদ্ধির তোড়জোড়? (ভর্তুকি ও ঘাটতির চিত্র)

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)-এর সারসংক্ষেপে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরে এই খাতে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় সাড়ে ৫৬ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল ঘাটতি মেটানো সরকারের বর্তমান বাজেটের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

পিডিবি তিনটি ভিন্ন বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে, যার মূল লক্ষ্য পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়িয়ে ৫ হাজার থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি কমিয়ে আনা।

বিপিডিবির আয়-ব্যয়ের পরিসংখ্যান ও বকেয়া সংকট

বর্তমানে বিদ্যুৎ খাত এক ভয়াবহ বকেয়া সংকটে ভুগছে। বিপিডিবির তথ্যমতে:

  1. আয় বনাম ব্যয়: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিডিবির আয় ৭০,৯২৬ কোটি টাকা হলেও ব্যয় হয়েছে ১,২৬,৫৮৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ নিট ঘাটতি ১৭,০২১ কোটি টাকা (ভর্তুকি পাওয়ার পর)।

  2. বকেয়া বিল: দেশি-বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া ৪৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা ১৬,৫০০ কোটি টাকারও বেশি।

  3. বাজেট ঘাটতি: চলতি অর্থবছরে বিপিডিবির জন্য প্রয়োজন প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা, কিন্তু বাজেটে বরাদ্দ মিলেছে মাত্র ৩৬ হাজার কোটি টাকা।

বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি আমদানিতে সরকারকে প্রতি মাসে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা বাড়তি ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। মূলত সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতেই সরকার এই ভর্তুকি দিচ্ছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্য সংকট: ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের সাম্প্রতিক আপডেট

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top