ফরিদপুরে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড: মানসিক ভারসাম্যহীন যুবকের কোদালের আঘাতে প্রাণ গেল তিনজনের

ফরিদপুরে কোদাল দিয়ে তিনজনকে হত্যা

ফরিদপুর সদর উপজেলায় এক মর্মান্তিক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডে স্তব্ধ হয়ে গেছে গোটা এলাকা। সোমবার (২৭ এপ্রিল) দিবাগত রাত ১০টার দিকে সদর উপজেলার আলিয়াবাদ ইউনিয়নের গদাধরডাঙ্গী গ্রামে ঘটে যায় এই ভয়াবহ ঘটনা। মানসিক ভারসাম্যহীন এক যুবক নিজের দাদি ও ফুপুকে কোদাল দিয়ে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে। তাদের বাঁচাতে ছুটে আসা এক নিরীহ রিকশাচালকও এই পাশবিক আক্রমণ থেকে রক্ষা পাননি — প্রাণ দিতে হয় তাকেও।

অভিযুক্ত কে এই আকাশ মোল্লা?

হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম আকাশ মোল্লা, বয়স ৪০ বছর। তিনি গদাধরডাঙ্গী গ্রামের হারুন মোল্লার ছেলে। এলাকাবাসী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আকাশ দীর্ঘদিন ধরেই মানসিকভাবে অস্থির ছিলেন। কখনো স্বাভাবিক আচরণ করতেন, আবার কখনো হঠাৎ করেই মাথা ঠিক থাকত না।

মানসিক এই সমস্যার কারণে তার বিয়েও দেওয়া হয়নি। পরিবারের এক আত্মীয়ের সহায়তায় ফরিদপুর যক্ষ্মা হাসপাতালে পিয়ন পদে চাকরি পেয়েছিলেন তিনি। তবে মানসিক অসুস্থতার সময়গুলোতে কর্মস্থলেও অনুপস্থিত থাকতেন।

আলিয়াবাদ ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. রাজ্জাক শেখ বলেন, “আকাশ মানসিকভাবে অস্থির প্রকৃতির ছেলে ছিলেন। যখন মাথা নষ্ট হতো, অফিসেও যেত না। আবার সুস্থ থাকলে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মানুষের মতোই আচরণ করত।”

কীভাবে ঘটল এই নৃশংসতা?

রাত ১০টার দিকে আকাশ মোল্লা হঠাৎ উন্মত্ত হয়ে ওঠেন এবং একটি কোদাল হাতে নিয়ে নিজের দাদি আমেনা বেগম (৭৫) ও ফুপু সালেহা বেগমের (৫৫) ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। একের পর এক কোদালের আঘাতে তিনি দুজনকে নির্মমভাবে হত্যা করেন।

চিৎকার ও আহাজারি শুনে পাশের বাড়ির রিকশাচালক কাবুল চৌধুরী (৪৯) ছুটে আসেন পরিস্থিতি সামলাতে। কিন্তু তাকেও রেহাই দেননি আকাশ। প্রতিবেশী এই নিরীহ মানুষটিকেও পিটিয়ে মেরে ফেলেন তিনি। কাবুল চৌধুরী গ্রামের সুলতান আহমেদের ছেলে এবং তার স্ত্রী ও তিন সন্তান রয়েছে।

এই ভয়াবহ ঘটনায় আরও দুজন প্রতিবেশী আহত হয়েছেন — রিয়াজুল ইসলাম (৩৮) ও আরজিনা বেগম (৩৮)। তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে আসতে গেলে আকাশের আক্রমণের শিকার হন। এলাকাবাসী উভয়কেই উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেছেন।

তিন নিহতের পরিচয়

নিহত ব্যক্তি বয়স পরিচয়
আমেনা বেগম ৭৫ আকাশ মোল্লার দাদি
সালেহা বেগম ৫৫ আকাশ মোল্লার ফুপু
কাবুল চৌধুরী ৪৯ প্রতিবেশী রিকশাচালক, সুলতান আহমেদের ছেলে

পুলিশের তৎপরতা ও পলাতক অভিযুক্ত

হত্যাকাণ্ডের পর আকাশ মোল্লা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহীদুল ইসলাম জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং আকাশকে গ্রেপ্তার করতে একাধিক দল মাঠে নামানো হয়েছে।

ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. শামছুল আজম স্বয়ং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। রাত পৌনে ১২টার দিকে তিনি জানান, তিনটি মরদেহ পুলিশি তত্ত্বাবধানে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হচ্ছে।

এলাকায় শোক ও আতঙ্কের পরিবেশ

এই মর্মান্তিক ঘটনার পর গদাধরডাঙ্গী গ্রামে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। বিশেষ করে তিন সন্তানের বাবা কাবুল চৌধুরীর মৃত্যুতে তার পরিবারের বুকফাটা আর্তনাদে কেঁদে উঠেছে গোটা পাড়া। একজন সাধারণ রিকশাচালক শুধু মানবিক দায়িত্ব থেকে অন্যকে বাঁচাতে এগিয়ে গিয়ে নিজের জীবনটুকুই হারিয়ে ফেললেন — এই বেদনা সহ্য করা কঠিন।

মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির সুচিকিৎসা ও তদারকির অভাবে এ ধরনের মর্মান্তিক পরিণতি যে ঘটতে পারে, এই ঘটনা তারই জ্বলন্ত প্রমাণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসার ব্যবস্থা করা গেলে এমন বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব ছিল।

ঘটনার পরবর্তী আপডেটের জন্য আমাদের সঙ্গে থাকুন।

আপডেট: অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব।

আরও পড়ুন: পদ্মা নদীতে জেলের বড়শিতে ধরা পড়ল বিশাল কুমির — ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে চাঞ্চল্য

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top