মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করলেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সামরিক সংঘাত প্রসঙ্গে তিনি এমন একটি মন্তব্য করেছেন, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। তাঁর দাবি — এই যুদ্ধে ওয়াশিংটন কেবল সামরিকভাবে নয়, কূটনৈতিক ও কৌশলগতভাবেও ক্রমশ ‘অপমানিত’ হচ্ছে।
মের্ৎসের বক্তব্য: সরাসরি ও নিঃসংকোচ
সোমবার জার্মানির ঐতিহাসিক শহর মার্সবার্গে শিক্ষার্থীদের সামনে বক্তৃতা দেওয়ার সময় ফ্রিডরিখ মের্ৎস এই বিষ্ফোরক মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র এখন এক গভীর কৌশলগত সংকটে আটকে গেছে। তেহরান ধীরে ধীরে এই সংঘাতে সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছে, আর ওয়াশিংটনের কাছে এই যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার কোনো সুস্পষ্ট পথ নেই।
মের্ৎস সরাসরি স্বীকার করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এই মুহূর্তে কার্যত ‘অপমানিত’ হওয়ার পথেই এগোচ্ছে। এটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত মতামত নয়, বরং ইউরোপের অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষকের উদ্বেগেরও প্রতিফলন।
ইতিহাসের আয়না: আফগানিস্তান ও ইরাকের শিক্ষা
জার্মান চ্যান্সেলর তাঁর যুক্তিকে শক্তিশালী করতে ইতিহাসের দিকে তাকান। তিনি বলেন, এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক জড়িত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো — প্রবেশ করা যতটা সহজ, বের হওয়া ততটাই কঠিন এবং বেদনাদায়ক।
তিনি আফগানিস্তানের উদাহরণ দেন। প্রায় দুই দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটো জোট সেখানে বিশাল সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছিল। কিন্তু ২০২১ সালে যখন মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করা হয়, তখন পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। বিশ বছরের যুদ্ধ, লক্ষ কোটি ডলার ব্যয় এবং অগণিত প্রাণহানির বিনিময়ে কার্যত শূন্য হাতে ফিরতে হয় পশ্চিমা জোটকে।
একইভাবে ইরাকের কথা উল্লেখ করে মের্ৎস বলেন, সেখানেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ শেষ পর্যন্ত একটি দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। এই দুটি নজির সামনে রেখে তিনি প্রশ্ন তোলেন — ইরানের ক্ষেত্রে কি ভিন্ন পরিণতি প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত?
হরমুজ প্রণালি ও জার্মানির অবস্থান
আলোচনার একপর্যায়ে মের্ৎস জানান, জার্মানি হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাইন অপসারণকারী জাহাজ মোতায়েন করতে প্রস্তুত। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। এই পথ যদি বন্ধ বা অনিরাপদ হয়ে পড়ে, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ভয়াবহ সংকট দেখা দিতে পারে।
তবে জার্মান চ্যান্সেলর একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত জুড়ে দেন — এই সামরিক সহযোগিতা কেবলমাত্র যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার পরেই সম্ভব। অর্থাৎ, বার্লিন সংঘাত চলাকালীন কোনো সামরিক অংশগ্রহণে নিজেদের জড়াতে রাজি নয়, বরং একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথেই জার্মানি এগোতে চায়।
অর্থনৈতিক ধাক্কা: জার্মানি ও ইউরোপের উদ্বেগ
মের্ৎস শুধু ভূরাজনৈতিক কারণেই নয়, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই যুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তি চান। তিনি স্বীকার করেন যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাব ইতিমধ্যে জার্মানির অর্থনীতিতে অনুভূত হতে শুরু করেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা জার্মান শিল্পখাতকে চাপে ফেলছে।
তিনি বলেন, “পুরো বিষয়টা এখন অত্যন্ত জটিল হয়ে গেছে এবং এতে আমাদের প্রচুর অর্থ ব্যয় হচ্ছে।” শিল্পনির্ভর জার্মান অর্থনীতির জন্য স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরান-সংঘাত যদি দীর্ঘ হয়, তাহলে ইউরোপের বৃহত্তম এই অর্থনীতি গুরুতর সংকটে পড়তে পারে।
ইউরোপজুড়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ
মের্ৎসের এই বক্তব্য এমন একটি সময়ে এল যখন পুরো ইউরোপ জুড়েই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের ব্যাপারে উদ্বেগ ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। ফ্রান্স, ইতালি এবং স্পেনসহ বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশ সরাসরি এই সংঘাতে জড়িত না হলেও কূটনৈতিকভাবে সমাধানের পথ খুঁজছে।
জ্বালানিসংকট, মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্নের কারণে ইউরোপের সাধারণ মানুষ ইতিমধ্যেই এই যুদ্ধের পরোক্ষ মূল্য দিতে শুরু করেছেন। এই পরিস্থিতিতে মের্ৎসের এই সরব অবস্থান ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ওয়াশিংটনের নীতির প্রতি ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ: যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত দুর্বলতা
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ প্রায়শই পরিকল্পিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল, কারণ তেহরানের কাছে রয়েছে শক্তিশালী প্রক্সি নেটওয়ার্ক, উল্লেখযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রভাব।
ইরান একটি বৃহৎ ও জনবহুল দেশ হওয়ায় সেখানে স্থলযুদ্ধ পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। আর বায়বীয় হামলায় কৌশলগত সুবিধা নেওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া কোনো স্থায়ী ফলাফল পাওয়া সম্ভব নয়। এই বাস্তবতাই মের্ৎসের উদ্বেগের মূল ভিত্তি।
শেষ কথা: কূটনীতিই একমাত্র পথ?
জার্মান চ্যান্সেলরের বক্তব্য থেকে একটি বার্তা স্পষ্ট — সামরিক শক্তির মাধ্যমে ইরান সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আফগানিস্তান ও ইরাকের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই একটি কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজা উচিত। বিশ্বের স্থিতিশীলতা, ইউরোপের অর্থনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের জীবন — সবকিছুই এই সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে।
মের্ৎসের এই সাহসী ও সরাসরি মন্তব্য ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কে নতুন টানাপড়েনের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
আরও পড়ুন: ইরানের প্রস্তাব মেনে নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র — সাবেক মার্কিন কর্মকর্তার মন্তব্যে নতুন মাত্রা
