মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এক চাঞ্চল্যকর দাবি তুলে ধরেছে — ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাত ইতোমধ্যেই সমাপ্ত হয়েছে। প্রশাসনের যুক্তি অনুযায়ী, গত এপ্রিলের শুরুতে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির মধ্য দিয়েই এই যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটেছে। এই অবস্থানটি শুধু কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, আইনি দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ — কারণ এর ভিত্তিতেই হোয়াইট হাউস দাবি করছে যে, সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখতে মার্কিন কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের আর কোনো প্রয়োজন নেই।
যুদ্ধবিরতিই হলো ‘যুদ্ধ সমাপ্তির’ ভিত্তি
ট্রাম্প প্রশাসনের এই দাবির কেন্দ্রে রয়েছে ৭ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তি। প্রশাসনের তরফ থেকে বলা হয়েছে, ওই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী এবং ইরানের মধ্যে আর কোনো সক্রিয় গুলিবর্ষণ বা সামরিক সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি। ফলে প্রশাসনের দৃষ্টিতে, এই সঙ্ঘাত এখন কার্যত নিষ্ক্রিয় বা সমাপ্ত একটি অধ্যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “প্রযোজ্য আইনের বিচারে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাত এখন শেষ হয়ে গেছে।” তাঁর মতে, যুদ্ধবিরতি পরবর্তী পরিস্থিতিতে আর কোনো সক্রিয় যুদ্ধাবস্থা বিদ্যমান নেই, তাই পূর্ববর্তী সংঘাতকে এখন আইনগতভাবে ‘সমাপ্ত’ বলে গণ্য করা হচ্ছে।
সিনেটে হেগসেথের যুক্তি
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) মার্কিন সিনেটে অনুষ্ঠিত এক উচ্চ-পর্যায়ের শুনানিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ একই অবস্থান দৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করেন। তিনি সিনেটরদের সামনে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বর্তমান যুদ্ধবিরতি কার্যকরভাবে সংঘাতটিকে থামিয়ে দিয়েছে এবং এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রক্রিয়া আর প্রাসঙ্গিক নয়।
হেগসেথের এই বক্তব্য সিনেটে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বিরোধী সিনেটরদের একাংশ প্রশ্ন তোলেন যে, একটি যুদ্ধবিরতিকে ‘যুদ্ধ সমাপ্তি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা আদৌ আইনসম্মত কিনা।
১৯৭৩ সালের যুদ্ধ ক্ষমতা আইন এবং কংগ্রেসের ভূমিকা
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ১৯৭৩ সালে পাস হওয়া মার্কিন যুদ্ধ ক্ষমতা রেজোলিউশন (War Powers Resolution)। এই আইন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যদি সশস্ত্র বাহিনীকে কোনো বৈদেশিক সামরিক অভিযানে মোতায়েন করেন, তাহলে ৬০ দিনের মধ্যে কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নিতে হবে — অন্যথায় অভিযান বন্ধ করতে হবে।
ট্রাম্প প্রশাসন এখন দাবি করছে, যেহেতু যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সক্রিয় সংঘাত আর নেই, তাই ৬০ দিনের সেই ঘড়ি আর চলছে না। ফলে কংগ্রেসের অনুমোদনের আইনি বাধ্যবাধকতাও উঠে গেছে বলে প্রশাসন মনে করছে।
তবে সমালোচকরা এই ব্যাখ্যাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তাদের মতে, যুদ্ধবিরতি মানে যুদ্ধের সমাপ্তি নয় — এটি কেবল সাময়িক বিরতি। বিশেষত যখন সমুদ্রে মার্কিন নৌ-অবরোধ এখনও অব্যাহত রয়েছে।
হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা কমেনি
যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হলেও ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর ওপর তার নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ণ রেখেছে। বিশ্বের তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ এই প্রণালীর মধ্য দিয়ে পরিবাহিত হয়, তাই এই অঞ্চলে ইরানের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক শক্তি বাজারে বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করছে।
একই সময়ে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে বাধা দেওয়ার লক্ষ্যে নৌ-অবরোধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে — যদি সত্যিই যুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে কেন মার্কিন নৌবাহিনী এখনও সক্রিয়ভাবে ইরানি জাহাজ আটকানোর অভিযান পরিচালনা করছে?
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ট্রাম্প প্রশাসনের এই দাবি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলেও আলোচনার ঝড় তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল একটি যুদ্ধবিরতিই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং তেহরানের সঙ্গে মার্কিন কূটনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই কৌশলগত আইনি অবস্থান মূলত কংগ্রেসের নজরদারি এড়িয়ে ভবিষ্যতে প্রয়োজনে নতুন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার পথ খোলা রাখার জন্য। যুদ্ধকে ‘সমাপ্ত’ ঘোষণা করলে যেমন একদিকে কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা এড়ানো যাচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে নতুন সংঘাতকে ‘নতুন ঘটনা’ হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগও থাকছে।
সব মিলিয়ে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের এই জটিল অধ্যায়ে ‘যুদ্ধ শেষ’ বলার দাবি যতটা না সামরিক বাস্তবতার প্রতিফলন, তার চেয়ে বেশি মনে হচ্ছে একটি আইনি ও রাজনৈতিক কৌশল — যা আগামী দিনে মার্কিন নীতিনির্ধারণীদের হাতকে আরও মুক্ত রাখবে।
আরও পড়ুন: ভূমধ্যসাগরে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি: নৌকা বিকল হয়ে আট দিন ভাসার পর ১৭ অভিবাসীর মৃত্যু, নিখোঁজ আরও ৯
