বৈশাখের দাবদাহের মাঝে ভয়াবহ বজ্রপাতে কেঁপে উঠল সারাদেশ। সোমবার (২৭ এপ্রিল) সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বজ্রপাতে মোট ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে আরও বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় প্রতিনিধি ও পুলিশ সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিহতদের বেশিরভাগই হাওড়ে ধান কাটতে গিয়ে এই মর্মান্তিক পরিণতির শিকার হয়েছেন।
নেত্রকোনায় তিন প্রাণের বিয়োগান্ত পরিণতি
নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলায় পৃথক তিনটি স্থানে বজ্রপাতে তিনজন নিহত হয়েছেন। তারা হলেন — ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার বাগবেড় গ্রামের মৎস্যজীবী আব্দুল মোতালিব (৫৫), একই এলাকার সাতগাঁও গ্রামের কৃষক মোনায়েম খাঁ পালান (৫৩) এবং সিরাজগঞ্জ জেলার আকনাদিঘীরচর গ্রামের ধান ব্যবসায়ী শুভ মণ্ডল।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্র জানায়, আব্দুল মোতালিব ভোরবেলা ধনু নদের জগন্নাথপুর ফেরিঘাটে বড়শি দিয়ে মাছ ধরছিলেন। হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড় ওঠে এবং বজ্রপাতে তার দেহ ঝলসে যায়। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু ঘটে। অপরদিকে মোনায়েম খাঁ বেলা ১১টার দিকে হাওড়ে ধান কাটছিলেন। তখন বজ্রাঘাতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং সেখানেই মারা যান। ধান ব্যবসায়ী শুভ মণ্ডল কয়েক দিন ধরে খালিয়াজুরী হাওড়ে ধান ক্রয় করছিলেন। দুপুরে হাওড়ে থাকাকালীন বজ্রাঘাতে তিনিও ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।
খালিয়াজুরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাসির উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ঘটনাস্থলগুলোতে পুলিশ পাঠানো হয়েছে এবং মরদেহ উদ্ধারের পর বিধিমোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাদির হোসেন শামীম জানান, নিহত তিনজনের পরিবারকে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।
সুনামগঞ্জে হাওড়ে ধান কাটতে গিয়ে প্রাণ গেল তিনজনের
সুনামগঞ্জ জেলায় সদর ও জামালগঞ্জ উপজেলায় বজ্রপাতে তিনজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া শান্তিগঞ্জ উপজেলায় আরও অন্তত তিনজন আহত হয়েছেন।
নিহতরা হলেন — সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার আব্দুল্লাপুর গ্রামের জমির উদ্দিন (৪৩), বৈটাখালি গ্রামের জমির হোসেন (৪০) এবং জামালগঞ্জ উপজেলার রূপাবলী গ্রামের আবু সালেক (২৫)।
জমির উদ্দিন বিকেল ৩টার দিকে দেখার হাওড়ের উৎমা বিলে ধান কাটছিলেন। আকস্মিক বজ্রপাতে মাঠেই লুটিয়ে পড়েন তিনি। দ্রুত সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। একই সময়ে জমির হোসেন বাড়ি থেকে বের হয়ে নদীঘাটে দোকান খুলতে যাওয়ার পথে বজ্রাঘাতে গুরুতর আহত হন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়।
জামালগঞ্জের আবু সালেক হাওড় থেকে গরু নিয়ে ফিরছিলেন। পথিমধ্যে বজ্রপাতে আহত হয়ে মাটিতে পড়ে থাকেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শফিকুর রহমান তিনজনের মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
হবিগঞ্জে দুই কৃষকের মৃত্যু, একজন আহত
হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ ও বানিয়াচং উপজেলায় বজ্রপাতে দুইজন কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। বিকেল ৩টার দিকে নবীগঞ্জ উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রাম-সংলগ্ন গড়দার হাওড়ে এবং বানিয়াচং উপজেলার জাতুকর্ণপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
বানিয়াচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা বেগম সাথী জানান, হাওড় থেকে ধান কেটে বাড়ি ফেরার পথে আব্দুল সালাম বৃষ্টির মধ্যে বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন। একই সময় গড়েরপাড় এলাকার কৃষক সামরুজ মিয়া (৫০) বজ্রপাতে আহত হন।
নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন জানান, নোয়াগাঁও গ্রামের মকসুদ আলী হাওড়ে ধান কাটার সময় বজ্রাঘাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান। তিনি জানান, নিহতের পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র এবং তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।
নোয়াখালীতে চা বিক্রেতার মর্মান্তিক মৃত্যু
নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার গামছাখালী গ্রামে বজ্রপাতে মো. আরাফাত (২৩) নামে এক তরুণ চা দোকানির মৃত্যু হয়েছে। সোমবার দুপুর ২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। মো. আফসার উদ্দিনের ছেলে আরাফাত স্থানীয় বাজারে চায়ের দোকান চালিয়ে সংসার চালাতেন।
হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল জানান, আরাফাত বাড়ির পাশের বাদামখেত দেখতে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে কালবৈশাখী ঝড়ের সাথে বজ্রপাতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং ঘটনাস্থলেই মৃত্যু ঘটে। স্বজনরা তার মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসেন।
তিনি সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে বলেন, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে কালবৈশাখী ঝড়ের সাথে বজ্রপাতের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এই সময় অপ্রয়োজনে বাইরে না গিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা উচিত।
বজ্রপাত থেকে বাঁচতে যা করবেন
বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাতের সময় নিচের সতর্কতাগুলো মেনে চললে প্রাণহানির ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব —
- আকাশ মেঘলা দেখা দিলে খোলা মাঠ বা হাওড়ে না থেকে দ্রুত ঘরে বা পাকা ভবনে আশ্রয় নিন।
- বজ্রপাতের সময় গাছের নিচে দাঁড়াবেন না।
- উঁচু স্থান, টাওয়ার বা বৈদ্যুতিক খুঁটির কাছে থাকা থেকে বিরত থাকুন।
- মাছ ধরা বা নৌকায় থাকলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যান।
- ঝড়বৃষ্টির পূর্বাভাস পেলে হাওড়ে ধান কাটার কাজ বন্ধ রাখুন।
উপসংহার
প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমের আগে-পরে বাংলাদেশে বজ্রপাতে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়। কৃষিনির্ভর হাওড় অঞ্চলের মানুষেরা এই ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি পড়েন কারণ ধান কাটার মৌসুমে তারা খোলা মাঠে দীর্ঘ সময় কাজ করেন। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আবহাওয়া সতর্কতা ব্যবস্থার উন্নয়ন এ ধরনের মৃত্যু কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আরও পড়ুন: মা এবং অনাগত শিশুর প্রাণহানি: সমাজের বিবেক জাগ্রত হওয়ার সময় এসেছে
