প্রযুক্তি বিশ্বে কর্মী ছাঁটাইয়ের মিছিল যেন থামছেই না। ২০২৪-২৫ সালের ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই ২০২৬ সালে এসে আবারও বড় দুঃসংবাদ দিল দুই টেক জায়ান্ট মেটা (ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান) ও মাইক্রোসফট। গত ২৩ এপ্রিল প্রতিষ্ঠান দুটি যৌথভাবে প্রায় ২০ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। অ্যামাজন ও গুগলের পর এই দুই শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের এমন সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিকর্মীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কোম্পানিগুলো এখন মানুষের পরিবর্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ফলে সাধারণ কর্মসংস্থান এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে।
মাত্র ৩ মাসেই ৯২ হাজার চাকরি উধাও
চাকরি ছাঁটাইয়ের পরিসংখ্যান রাখা আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইট Layoffs.fyi-এর তথ্যমতে, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই প্রযুক্তি খাত থেকে ৯২ হাজারেরও বেশি কর্মী কাজ হারিয়েছেন। পরিসংখ্যনটি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন দেখা যায় ২০২০ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখ মানুষ এই খাতের চাকরি হারিয়েছেন।
নেতৃত্ব বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি টাগলের মতে, এটি কেবল কোনো সাময়িক মন্দা নয়; বরং এটি কাজের ধরনের একটি স্থায়ী রূপান্তর। যেখানে মানুষের সৃজনশীলতার চেয়ে এআই-এর গতিকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
খরচ কমাতে প্রযুক্তিতে ভরসা
মেটা, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন এবং গুগল—প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই এখন এআই অবকাঠামো তৈরিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। হিসাব অনুযায়ী, এআই খাতে তাদের বার্ষিক বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৭০০ বিলিয়ন ডলার।
-
মেটা: তাদের মোট কর্মীবাহিনীর ১০ শতাংশ বা একটি বড় অংশ কমিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
-
মাইক্রোসফট: ৫২ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কর্মীদের ‘স্বেচ্ছায় পদত্যাগ’ (Voluntary Resignation)-এর সুযোগ দিচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রায় ৮ হাজার ৭৫০ জন কর্মীকে বিদায় করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
বড় কোম্পানিগুলোর কৌশল এখন স্পষ্ট—কম মানুষ ব্যবহার করে প্রযুক্তির সাহায্যে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। আগে যে পরিমাণ আয় করতে ২৫০ জন কর্মী লাগত, এখন এআই-এর কল্যাণে মাত্র ৫০ জন দিয়েই সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হচ্ছে।
প্রযুক্তি খাতের বাইরেও ছাঁটাইয়ের প্রভাব
ছাঁটাইয়ের এই ঢেউ কেবল আইটি ফার্মেই সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বখ্যাত স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড নাইকি তাদের প্রযুক্তি বিভাগ থেকে ১ হাজার ৪০০ কর্মী ছাঁটাই করছে। এ ছাড়াও স্ন্যাপ তাদের ১৬ শতাংশ এবং সেলসফোর্স ৪ হাজার কর্মীকে অব্যাহতি দিয়েছে। মূলত ব্যবসায়িক খরচ কমিয়ে প্রফিট মার্জিন বাড়াতে গিয়ে ‘মানুষ’ এখন দ্বিতীয় অপশনে পরিণত হচ্ছে।
বেতন ও আত্মবিশ্বাসে ভাটা
চাকরি খোঁজার প্ল্যাটফর্ম গ্লাসডোর-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বর্তমানে প্রযুক্তিকর্মীদের কাজের আত্মবিশ্বাস সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ছাঁটাইয়ের ভয়ে অনেকে বর্তমান চাকরি ছাড়তে সাহস পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, বাজারে সাধারণ আইটি কর্মীদের বেতন এখন প্রায় স্থবির। তবে যারা এআই ইঞ্জিনিয়ারিং বা স্পেশালাইজড টেকনিক্যাল স্কিলে দক্ষ, তাদের চাহিদা ও বেতন আকাশচুম্বী।
অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল ঝাও-এর মতে, আমরা এক অদ্ভুত প্রযুক্তিগত বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এআই হয়তো ভবিষ্যতে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করবে, কিন্তু বর্তমানের সাধারণ কর্মীবাহিনীর জন্য টিকে থাকাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আরও পড়ুন: আলোর মাধ্যমে রোগ নির্ণয়: তিন বাংলাদেশির বিশ্বজয়ী উদ্ভাবন
