সম্পত্তির নেশা ও পারিবারিক কোন্দল যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন সম্পর্কের মায়া তুচ্ছ হয়ে যায়। নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় এমনই এক লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে একই পরিবারের চারজনকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। নিহত হাবিবুর রহমানের আপন দুই ভাগ্নে ও দুলাভাই মিলে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
হত্যাকাণ্ডের কারণ: ১৭ বিঘা জমির বিরোধ
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, বাহাদুরপুর গ্রামের নমির উদ্দিনের মোট ১৭ বিঘা সম্পত্তি ছিল। তিনি তার একমাত্র ছেলে হাবিবুর রহমানকে বসতবাড়িসহ ১৩ বিঘা জমি লিখে দেন এবং বাকি জমি তার পাঁচ মেয়েকে ভাগ করে দেন। ভাইকে বেশি জমি লিখে দেওয়া নিয়ে বোন, ভগ্নিপতি ও ভাগ্নেদের মনে ক্ষোভ জন্মায়। মূলত পুরো পরিবারকে নির্বংশ করতে পারলেই সম্পত্তির পরবর্তী উত্তরাধিকারী হওয়া যাবে—এমন কুৎসিত লালসা থেকেই এই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
যেভাবে সাজানো হয় হত্যার ছক
সোমবার বিকেলে গরু কেনার উদ্দেশ্যে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে বাজারে যান হাবিবুর। তার সঙ্গে ছিল ভাগ্নে সবুজ রানা। গরু না কিনেই তারা বাড়িতে ফেরেন। এরপরই সবুজ রানা, তার খালু শহিদুল ইসলাম এবং খালাতো ভাই শাহিনসহ মোট ছয়জন মিলে হত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করে।
-
বিশ্বাসঘাতকতা: ঘটনার রাতে সবুজ রানা তার মামার বাড়িতেই সবার সাথে রাতের খাবার খায়।
-
অনুপ্রবেশ: সবার অগোচরে একজন ভাগ্নে ঘরের ভেতর লুকিয়ে থাকে এবং গভীর রাতে বাড়ির মূল দরজা খুলে দেয়।
-
নৃশংসতা: খুনিরা প্রথমে হাবিবুরকে ঘুমন্ত অবস্থায় গলা কেটে হত্যা করে। এরপর একে একে তার স্ত্রী পপি সুলতানা এবং দুই নিষ্পাপ শিশু পারভেজ ও সাদিয়াকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
এলাকাবাসীর ক্ষোভ ও অগ্নিসংযোগ
বুধবার সকালে এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজিত এলাকাবাসী প্রধান অভিযুক্ত সবুজ রানার বাড়িতে হামলা চালায়। উত্তেজিত জনতা বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। রাস্তা দুর্গম হওয়ায় ফায়ার সার্ভিস পৌঁছাতে দেরি হলে গ্রামবাসী নিজেরাই পাম্পের সাহায্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে অগ্নিকাণ্ডে বাড়ির আসবাবপত্রসহ সব মালামাল ছাই হয়ে গেছে।
পুলিশি তদন্ত ও গ্রেপ্তার
নওগাঁর পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ঘটনার পরদিন মঙ্গলবারই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ বেশ কয়েকজনকে হেফাজতে নেয়। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মুখে সবুজ রানা হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী:
-
হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি হাসুয়া খড়ের পালা থেকে উদ্ধার করা হয়।
-
একটি ছুরি স্থানীয় পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়।
-
অভিযুক্ত শহিদুল ইসলাম, শাহিন হোসেন ও সবুজ রানাকে গ্রেফতার করে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার আরও জানান, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং এই ঘটনার সাথে জড়িত বাকিদেরও আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।
আরও পড়ুন: মুফতি আমির হামজার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা: বিপাকে কুষ্টিয়ার সংসদ সদস্য