ইবাদত নিয়ে অহংকার নয়: আত্মিক ধ্বংসের এক নীরব ব্যাধি

ইবাদত নিয়ে অহংকার

ইসলামের দৃষ্টিতে ইবাদত হলো মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। কিন্তু সেই ইবাদত যদি মানুষের মনে অহংকারের জন্ম দেয়, তবে তা উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করে। অহংকার এমন একটি ভয়াবহ গুনাহ, যা মানুষের হাজার বছরের নেক আমলকে মুহূর্তেই ছাই করে দিতে পারে। বিশেষ করে নিজের ইবাদত, আমল বা ধার্মিকতা নিয়ে গর্ব করা আধ্যাত্মিক পতনের মূল কারণ।

অহংকার কেন খতরনাক গুনাহ?

নিজের সম্পদ, সৌন্দর্য কিংবা সামাজিক অবস্থান নিয়ে অন্যকে তুচ্ছ মনে করাই হলো অহংকার। আসলে আমাদের যা কিছু আছে—তা হোক মেধা কিংবা রূপ—সবই আল্লাহর আমানত। মনে রাখা প্রয়োজন, যার নেয়ামত যত বেশি, তার পরীক্ষার পাল্লাও তত ভারী। আউলিয়ায়ে কেরাম ও বুজুর্গরা সর্বদা নিজেদের শেষ পরিণতি নিয়ে চিন্তিত থাকতেন। তারা মনে করতেন, ইবাদত করতে পারাটা নিজের কোনো কৃতিত্ব নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া এক বিশেষ তাওফিক বা সুযোগ।

৫০০ বছর ইবাদতকারী আবেদের সেই ঘটনা

হাদিস শাস্ত্রে (মুস্তাদরাক হাকেম ও শুআবুল ইমান) জিবরাইল (আ.)-এর মুখে বর্ণিত একটি চমকপ্রদ ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। জাবীর ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের এই ঘটনাটি শুনিয়েছেন:

একদা এক আবেদ ব্যক্তি নির্জন পাহাড়ের চূড়ায় একটানা ৫০০ বছর আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তার জন্য সেই পাহাড়ে একটি মিষ্টি পানির ঝরনা ও একটি আনার গাছের ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি প্রতিদিন একটি আনার খেতেন এবং সারারাত নামাজে কাটিয়ে দিতেন। তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন যেন সেজদারত অবস্থায় তার মৃত্যু হয় এবং দেহ অক্ষত থাকে। আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেন।

ইবাদত বনাম আল্লাহর রহমত: বিচার দিবসের শিক্ষা

কিয়ামতের দিন আল্লাহ সেই আবেদকে বলবেন, “আমার রহমতে তুমি জান্নাতে প্রবেশ করো।” কিন্তু নিজের ইবাদতের ওপর অতি আত্মবিশ্বাসী আবেদ বলবেন, “হে আল্লাহ! আমি আমার ৫০০ বছরের ইবাদতের বিনিময়ে জান্নাতে যেতে চাই।”

তখন আল্লাহ ফেরেশতাদের বলবেন আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত আর বান্দার ইবাদতের একটি তুলনা করতে। দেখা গেল, শুধুমাত্র তার একটি চোখের দৃষ্টিশক্তির মূল্যের কাছে তার ৫০০ বছরের ইবাদত কিছুই নয়। ফেরেশতারা যখন তাকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যেতে শুরু করবেন, তখন তিনি নিজের ভুল বুঝতে পারবেন এবং আল্লাহর রহমতের ভিখারি হবেন।

আল্লাহ তখন তাকে মনে করিয়ে দেবেন—তার অস্তিত্ব, তার ইবাদতের শক্তি, লবণাক্ত পানির মাঝে মিষ্টি পানির ঝরনা আর অমৌসুমে প্রতিদিন একটি করে আনার পাওয়া—এসবই ছিল আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। পরিশেষে আল্লাহ বলবেন, “আমার রহমতেই তুমি জান্নাতে প্রবেশ করো।”

আমাদের শিক্ষণীয়

এই ঘটনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, আমাদের নামাজ, রোজা বা দান-সদকা দিয়ে জান্নাত কেনা সম্ভব নয়। আমরা যতটুকু ইবাদত করি, তা আল্লাহর অসীম নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের সামান্য প্রচেষ্টামাত্র। তাই ইবাদত করে নিজেকে অন্যের চেয়ে বড় ভাবার কোনো অবকাশ নেই। ইবাদত করার সুযোগ পাওয়াও আল্লাহর একটি দান, যা নিয়ে অহংকার নয় বরং বিনয়ী হয়ে আরও বেশি শুকরিয়া আদায় করা উচিত।

আরও পড়ুন: অতিথি আপ্যায়নের বরকত: ইসলামে মেহমানদারির গুরুত্ব ও ফজিলত

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top