হোয়াইট হাউস সংবাদদাতাদের বার্ষিক নৈশ ভোজে ভয়াবহ গুলির ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলার বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন — এই ঘটনা তাকে ইরানের বিরুদ্ধে তার নির্ধারিত কৌশল থেকে এক বিন্দুও সরাতে পারবে না।
নৈশ ভোজে আচমকা গুলির শব্দ, তড়িঘড়ি সরানো হলো ট্রাম্পকে
শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাতে ওয়াশিংটন ডিসির ঐতিহ্যবাহী ওয়াশিংটন হিলটন হোটেলে হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক নৈশ ভোজ অনুষ্ঠান চলছিল। দেশের শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিক, কর্মকর্তা এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের নিয়ে জমজমাট এই অনুষ্ঠানেই হঠাৎ ভেসে আসে একের পর এক গুলির শব্দ।
যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিসের তথ্যমতে, মোট সাত থেকে আটটি গুলির শব্দ শোনা যায়। সঙ্গে সঙ্গে সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টরা চিৎকার করে সবাইকে টেবিলের নিচে আশ্রয় নিতে বলেন। মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্কে ভেঙে পড়েন অতিথিরা। কেউ মেঝেতে শুয়ে পড়েন, কেউ ছুটে যান টেবিলের আড়ালে।
দ্রুততার সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে এফবিআই প্রধান কাশ প্যাটেলসহ বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকেও সেখান থেকে বের করে আনা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার পর সন্দেহভাজন শ্যুটারকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয় এবং মার্কিন অ্যাটর্নি অফিস জানায়, তার বিরুদ্ধে দুটি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
ট্রাম্পের সরাসরি প্রতিক্রিয়া: “আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়িনি”
ঘটনার পরদিন হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সামনে মুখ খোলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তার বক্তব্যে ফুটে ওঠে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিকের দৃঢ়তা ও মানসিক শক্তি।
তিনি বলেন, “প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব অত্যন্ত বিপজ্জনক।” তবে এই বিপদ তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ট্রাম্পের ভাষায়, “অনেক মানুষ এ ধরনের পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। আমি সেরকম নই। আমি বিষয়গুলো যেমন আছে, ঠিক তেমনভাবেই নিই।”
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও জানান, হামলার আগে কোনো ধরনের হুমকি বা পূর্বসতর্কতার খবর তার কাছে ছিল না। তিনি বলেন, “আমরা কিছুই জানতাম না। প্রথমে মনে হয়েছিল হয়তো কোনও ট্রে পড়ে যাওয়ার শব্দ, কিন্তু মুহূর্তেই বোঝা গেল বিষয়টা ভিন্ন।”
নিরাপত্তা প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, কক্ষজুড়ে সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্টরা সাধারণ অতিথিদের ছদ্মবেশে মোতায়েন ছিলেন। ফলে হামলাকারীর পক্ষে তার কাছে পৌঁছানো ছিল প্রায় অসম্ভব। তিনি বলেন, “সে আমার থেকে অনেক দূরে ছিল।” পরিস্থিতি মোকাবেলায় যারা সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তাদের প্রশংসাও করেন ট্রাম্প।
ইরান কি জড়িত? ট্রাম্প বললেন, “এমন মনে করার কারণ নেই”
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে — এই হামলার পেছনে কি ইরানের কোনো ভূমিকা রয়েছে? কারণ সাম্প্রতিক সময়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক চরমে উঠেছে।
ট্রাম্প স্পষ্ট জানান, এই হামলার সঙ্গে ইরান সংঘাতের সরাসরি কোনো যোগসূত্র থাকার এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, “এর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক আছে কি না আমি জানি না, তবে এমনটা মনে করার কারণ নেই।” হামলাকারীকে তিনি একজন ‘বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
তবে তদন্তকারী সংস্থাগুলো এখনো হামলাকারীর প্রকৃত উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা খতিয়ে দেখছে।
ইরান আলোচনা বাতিল, যুদ্ধের পথে অটল ট্রাম্প
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রায় দুই মাস ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যে তেহরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ইরানের আলোচনার ধরনে সন্তুষ্ট হতে পারেননি ট্রাম্প। এর ফলে শনিবারই তিনি ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার জন্য পাকিস্তান সফরে যাওয়ার কথা থাকা তার বিশেষ দূতদের সফর বাতিল করে দেন।
ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, এই হামলার ঘটনা তাকে ইরান যুদ্ধে জয়লাভ করার লক্ষ্য থেকে সরাতে পারবে না। তার ভাষায়, “ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করা থেকে এই ঘটনা আমাকে আটকাতে পারবে না।”
মেলানিয়ার উদ্বেগ, ট্রাম্পের অকুণ্ঠ স্বীকারোক্তি
ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের প্রসঙ্গও উঠে আসে ট্রাম্পের বক্তব্যে। তিনি জানান, মেলানিয়া বারবার তাকে সতর্ক করেন যে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ট্রাম্প বলেন, “তার জন্যও বিষয়টি ঝুঁকিপূর্ণ।”
তা সত্ত্বেও ট্রাম্প জানান, তিনি যতটা সম্ভব স্বাভাবিক জীবন যাপনের চেষ্টা করেন এবং দেশের জন্য কাজ চালিয়ে যাওয়াই তার প্রধান লক্ষ্য।
হামলার পর হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও কড়া করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই ঘটনা কেবল একটি নিরাপত্তা সংকট নয়, এটি বর্তমান মার্কিন রাজনৈতিক পরিবেশের জটিলতা ও ইরান সংকটের গভীরতাকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। আগামী দিনগুলোতে তদন্তের অগ্রগতি এবং ইরান নীতির পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই থাকবে সারা বিশ্বের দৃষ্টি।
