Azgar Ali

Loading Bangladesh Time... 00:00 AM

ভুল সিদ্ধান্ত ও ভয়াবহ পরিণতি: আমার জীবনের বাস্তব গল্প

একটা ভুল সিদ্ধান্ত জীবনের অনেক বড় ক্ষতি করতে পারে। সিদ্ধান্ত নিতে হলে বারবার ভাবা উচিত। একটা সিদ্ধান্ত যেমন জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে, আবার জীবনকে শেষও করে দিতে পারে। আজ আমার বাস্তব জীবনে ঘটে যাওয়া একটা ভুল সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আপনাদের জানাব। এখান থেকে কিছুটা হলেও শিক্ষা নিতে পারবেন।

আমি তখন ইন্টার পাস করেছি। ডিগ্রি কলেজে বিএসএস গ্রুপে ভর্তি হয়েছি। সামনে ছিল দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা। আমার বাড়ি থেকে ১ কিলোমিটার দূরে একটি ছোট বাজারে আমার একটি কম্পিউটারের দোকান ছিল। কম্পিউটার বিক্রি করতাম, এমন নয়। কম্পিউটার-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজ করতাম; যেমন—প্রিন্টিং, স্ক্যান, অনলাইনে ভর্তি, ছবি তোলা ইত্যাদি। মোবাইলের মেমোরিও লোড করতাম। দিন কোনো রকমে যাচ্ছিল আরকি। তখন আমি বিয়ে করেছি এবং আমার একটা মেয়েও ছিল।

আমি ইউটিউবে কাজ করতাম। মোবাইল দিয়ে ফানি ভিডিও তৈরি করতাম। হালকা-পাতলা কিছু আয় হতো। ইউটিউবের সুবাদে আমার সঙ্গে একজন মাদরাসা শিক্ষকের পরিচয় হয়। উনাকে আমাদের বাসায়ও নিয়ে এসেছিলাম। আমার বাসা থেকে উনার বাসার দূরত্ব ছিল প্রায় ৩ কিলোমিটার। তিনি দিনাজপুরে একটি মাদরাসা পরিচালনা করতেন। উনারও একটি ইউটিউব চ্যানেল ছিল। তিনি সেটার কারিগরি সহায়তা আমার কাছ থেকে নিচ্ছিলেন। আমি যতটুকু পেরেছি, সহযোগিতা করেছি।

তো, এভাবে বেশ কিছুদিন যাওয়ার পরে তিনি আমার সম্পর্কে, আমার পরিবার সম্পর্কে বেশ ভালোই জানলেন। হঠাৎ আমাকে একটি প্রস্তাব দিলেন। উনি বললেন যে, দিনাজপুরের ঘাসিপাড়ায় একটি প্রেস রয়েছে, যেখানে লোক লাগবে। বেতন ১২ হাজার টাকা এবং থাকা-খাওয়া নিজের। আমার কাছে ভালোই মনে হলো। প্রেসে থাকলে আমি বেশ ভালোভাবে ডিজাইনের কাজও শিখতে পারব, যা ভবিষ্যতে আমার কাজে লাগবে।

আসলে এটা ছিল আমার চরম একটা ভুল সিদ্ধান্ত। কেন চরম ভুল সিদ্ধান্ত বলছি, তা বুঝতে পারবেন। পড়তে থাকুন।

উনার কাছে এসব শুনে আমার পরিবারকে আমি জানালাম। তারাও কেমন যেন কোনো চিন্তা-ভাবনা না করেই আমাকে পাঠানোর জন্য রাজি হয়ে গেলেন। তারপর আমার দোকানটা আরেকজনের কাছে বিক্রি করে দিলাম। শুধু কম্পিউটারটা আমার কাছে রাখলাম। বাকি সবকিছু অল্প কিছু টাকায় গ্রামেরই আরেকজন ভাই নিয়ে নিলেন। তিনি এখনও দোকান করছেন সেখানে।

আমি কয়েক দিন পরে বাসা থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং আমার কম্পিউটার নিয়ে চলে গেলাম দিনাজপুর। সেখানে যাওয়ার পরে হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বাস থেকে নামলাম। তারপর ওই মাদরাসা শিক্ষককে ফোন করি। উনি কলও ধরেন না। সেই সময় আবার বৃষ্টি শুরু হলো। প্রায় ৩০ মিনিট পরে উনি কল ধরলেন এবং আরও কিছু সময় পরে আমার কাছে এলেন।

তারপর প্রেসের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। প্রেসে গিয়েই প্রেস মালিককে দেখে আমার ভালো লাগল না। উনি নিজেকে কী মনে করতেন, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। আমি একজন নতুন মানুষ। আমি গিয়েছি, কিন্তু উনি আমার সঙ্গে কোনো কথাই বললেন না। এই মাদরাসা শিক্ষকও আসলে ওইভাবে কোনো আলোচনাই করেননি। আমাকে উনার প্রেসে পৌঁছে দিয়ে প্রেস মালিকের সঙ্গে কয়েকটি কথা বলে আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।

এদিকে আমি সেই সকাল ১০টার পর থেকে না খেয়ে ছিলাম।

আমার থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। একটু টয়লেট বা ওয়াশরুমে যাব, সেটারও ব্যবস্থা নেই। আমার টোপলা-টাপলি নিয়ে সেই দোকানেই বিকাল ৫টা পর্যন্ত বসে থাকলাম। তারপর প্রেস মালিক একটা জায়গায় থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। সেই বাসায় আমি সবকিছু নিয়ে উঠলাম। কোনো পরিবেশ নেই, খুব কষ্টের জায়গা। আমি আপনাদের আসলে লিখে সেই কষ্টগুলো বোঝাতে পারব না।

আমার পকেটে তেমন টাকাও ছিল না। বাসা থেকে সম্ভবত মাত্র ৫০০ টাকা দিয়েছিল। সেই টাকা গিয়ে গাড়িভাড়া দিয়েছি। বাসায় টাকাই ছিল না, দেবে কোথা থেকে?

যাই হোক, আমার পেটে ভাত গেল রাত ১০টার দিকে। তারপরও রান্নাবান্না (মেসের) তেমন ভালো নয়। কষ্ট করে খেয়েছি। মেসে যে রুমে থাকতাম, সেই রুমে আরেকটা ভাই ছিল। সম্ভবত দিনাজপুর সরকারি কলেজে পড়ত। উনি বাসা থেকে টাকা নিয়ে আসতেন। মাঝে মাঝে বিভিন্ন বাইরের হোটেলে গিয়ে খাওয়া করতেন। আমাকে প্রায়ই বলতেন। আমি ওদের সঙ্গে যেতে পারতাম না। কারণ, আমার তো পকেট ফাঁকা ছিল। সেটা আমি তাদের বুঝতে দিতাম না। বিভিন্ন কথাবার্তা বলে কাটিয়ে দিতাম।

শুক্রবার করে প্রেস বন্ধ থাকত। বাকি ছয় দিনই প্রেসে কাজ চলত। প্রেসে আরেকটা ভাই আসতেন। উনিই মূলত ডিজাইনার। ভাইটা খুব ভালো মনের মানুষ ছিলেন। তার কোনো অহংকার ছিল না। বর্তমানে ওই প্রেসে থাকেন না। নিজেই দোকান দিয়েছেন। উনার নাম হলো রিয়াদ। দিনাজপুরে উনার ‘বিসমিল্লাহ কম্পিউটার অ্যান্ড গ্রাফিক্স’ নামে দোকান রয়েছে।

উনার কাছে আমি শিখতাম। ছোটখাটো ডিজাইন করে দিতাম। বিভিন্ন লেখা লিখে দিতাম। দোকান গুছিয়ে রাখতাম। প্রতিদিন ঝাড়ু দিতাম। এইসব কাজ করতাম আরকি। প্রেস মালিক যাতে সন্তুষ্ট থাকেন, সেই চেষ্টা করতাম।

এভাবে প্রায় ১ মাস হয়ে গেল। তখন বেতন পাওয়ার সময় এলো। প্রেস মালিক আমায় মাত্র ৩ হাজার টাকা দিলেন। আমি তো পুরোপুরি অবাক। আমি বললাম, ‘এই টাকা দিয়ে আমি কী করব? এটাতো আমার মেস ভাড়া দেওয়ার টাকাও না।’

তখন উনি বললেন, উনি সর্বোচ্চ ৪ হাজার টাকা আমাকে দিতে পারবেন। এই টাকায় যদি আমি থাকি, থাকব; নইতো না।

আমি তখন ওই মাদরাসা শিক্ষককে বিষয়টি জানাই। উনিও আমাকে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। ওদিকে আমি যে বাসায় এসে আমার দোকানটা চালু করব, সেই বুদ্ধিও আর নেই। কারণ, আমি তো সেটা বিক্রি করেই চলে গেছি।

আমি বিক্রি করতে চাইনি। কিন্তু আমার বড় ভাই তার অভাবের তাড়নায় দোকানটা বিক্রি করতে আমাকে বাধ্য করেছিলেন।

তারপর আমি ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলাম। কী করব, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কারণ, বাসায় গেলেও সমস্যা। বাসায় তো আর করার মতো কিছু নেই। আর বাসা থেকেও টাকা চাইছিল। জানেই যে, মাস শেষে আমি ১২ হাজার টাকা পাব। হয়তো আমার খরচ হবে ৫ হাজার বা ৬ হাজার টাকা। বাকি ৬ হাজার টাকা আমি বাসায় পাঠাতে পারব।

একটা পরিবারে কতটা সমস্যা থাকলে এমন চিন্তা তারা করতে পারে—ভেবে দেখুন।

আমি আমার বিষয়টা বাসায় জানাতে পারছিলাম না। কারণ, তারা তখন আমার ওপর অনেক দোষ চাপাত। আমার স্ত্রীর কাছে বুদ্ধি চাইলাম। সেও কিছু বলতে পারল না। আমার যা ইচ্ছা, তাই করতে বলেছিল। সেই পরিস্থিতিতে আমি বড় একা হয়ে গিয়েছিলাম।

ওদিকে আমার শরীরে চর্মরোগ ছিল। কোনো ভালো ডাক্তার দেখিয়ে কোনো চিকিৎসাই করতে পারিনি। সম্ভবত সোরিয়াসিস রোগ। টেনশন করলে সেই রোগ বাড়ে। এসব চিন্তায় এই রোগটাও বাড়ছিল।

প্রেস থেকে আমাকে যে টাকা দিয়েছে, সেই টাকা মেসে দিয়েছি। মেস ছাড়তে গেলে আরও টাকা দিয়ে ছাড়তে হবে। কী করব, কোনো কূল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

তখন আমার এক বন্ধু আলী আকবরের কাছে কল দিলাম। তাকে সবকিছু খুলে বললাম। সে আমার কাছ থেকে সবকিছু শুনে আমাকে ৩৫০০ টাকা পাঠাল এবং ঢাকায় আসতে বলল।

তখন রমজান মাস চলছিল। এদিকে বাড়ি থেকে টাকা চাইছিল। আমার কাছে সিম্ফনি ব্র্যান্ডের একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন ছিল। তখন ওই ফোনটা ওই মাদরাসা শিক্ষকের কাছে বিক্রি করে দিলাম। সম্ভবত ৩ হাজার টাকা নিয়েছিলাম। সেই টাকা বাসায় দিয়েছি আমার বেতনের কথা বলে।

আপনারা বিশ্বাস করবেন না—আমার এখন চিৎকার দিয়ে কান্না পাচ্ছে। আমি খুব খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে দিনগুলো পার করেছি।

তারপর আমার সমস্ত জিনিসপত্র, বিশেষ করে কম্পিউটার, ওই মাদরাসা শিক্ষকের বাসায় রেখে (দিনাজপুরে উনার মাদরাসায়) আমি ঢাকায় আসার জন্য টিকিট কাটলাম।

সারাদিন আমি না খাওয়া। সন্ধ্যার পরে শুধু ইফতারি করেছি। আর এসব ঘটনার কিছুই আমার পরিবার জানত না। শুধু আমার স্ত্রী জানত। ওর কাছে শেষ পর্যন্ত ৫০০ টাকা চেয়েছি। তবুও সে জোগাড় করে দিতে পারেনি। সে তখন তার বাবার বাড়িতে ছিল।

এরপর ভোর ৫টায় আমি ঢাকায় পৌঁছালাম। কমলাপুর রেলস্টেশনের কাছে হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে নামলাম। তারপর আমার বন্ধুটাকে কল দিলাম। সে এসে আমাকে রিসিভ করে নিয়ে গেল।

তারপর গিয়ে দেখি, একটা রুমের মধ্যে গাদাগাদি করে ৬/৭ জন থাকতে হয়। তারা সবাই পড়াশোনা করে। সেখানে আমার বন্ধুর বড় ভাইও ছিল। ওই বড় ভাইয়ের সঙ্গে আমার আগে থেকেই সম্পর্কও ছিল। উনি পশু চিকিৎসায় পারদর্শী। আমাদের গ্রামে এসে একসময় চিকিৎসা করতেন, আর আমি উনার সঙ্গে থাকতাম।

যাই হোক, আগেই বলেছি, তখন রমজান মাস চলছিল। আমি খুবই ক্ষুধার্ত ছিলাম। আমার বন্ধুকে বলেছি, আমি রোজা ছিলাম। সে আর আমাকে কিছু খেতে বলেনি।

আমার শরীরেও রোগটা খুব বেড়ে গিয়েছিল। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে ইফতার করলাম। রাত ৯টার সময় রাতের খাবার খেলাম। খাবার সীমিত, যেহেতু সেটা একটা মেস ছিল। ওইভাবেই কষ্ট করে খাচ্ছিলাম।

আমার বন্ধু আমাকে রিকশা চালানোর কথা বলে নিয়ে গিয়েছিল। কিছুদিন রিকশা চালানোর পর হয়তো কোনো টিউশনি যদি ব্যবস্থা করতে পারে, তখন টিউশনি করব। তার কথায় আমি রাজি হয়েই এসেছি।

কিন্তু সেখানে যে বড় ভাইগুলো থাকত, তারা আমার বিষয়টিকে পজিটিভলি নেয়নি। তারা রিকশা নিয়ে দিতে না করছিল। যদি রিকশা হারিয়ে যায় বা অন্য কোনো সমস্যা হয়, তখন সমস্ত চাপ আমার বন্ধুর ওপর পড়বে এবং আরও কিছু বিষয়কে কেন্দ্র করে।

যাই হোক, আমার বন্ধু দমে যায়নি। সে আমাকে পরের দিন—আমি যেদিন ঢাকায় এসেছি, তার পরের দিন—একটা রিকশা গ্যারেজে নিয়ে গেল এবং পরিচয় করিয়ে দিল।

রিকশা গ্যারেজ মালিক আমাকে দেখেই বলল যে, আমি তো রিকশা চালাতে পারব না। আমার শরীরে সমস্যা, এগুলো রোদে গেলে বেড়ে যাবে।

উনার কথা কিন্তু ঠিক। রোদে গেলে আমার এই রোগ বেড়ে যায়। আর তখন শরীরের রোগটা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। একটা ক্রিম কেনার মতো টাকাও থাকত না পকেটে।

তো, তারপরও বলে-কয়ে আমার বন্ধুটাই একটা রিকশা নিল। নেওয়ার পরে সে নিজেই রিকশায় বসল এবং আমাকে চালাতে বলল। আমি তাকে ১০ মিনিটের মতো চালালাম। তারপর সে বলল, ‘পারবা ইনশাআল্লাহ।’

এই বলে রিকশা আমাকে দিয়ে চলে গেল।

কিন্তু আমি ওই ১০ মিনিট চালিয়েই খুব ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আমি যেন আর পারছিলাম না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। আমি আমার বন্ধুটাকে বুঝতে দিইনি।

তারপর আমি রিকশা নিয়ে এক বিল্ডিংয়ের নিচে বসে আছি। ভাবছি, না—এটা আমার দ্বারা সম্ভব না। রোজা না থাকলে হয়তো পারতাম। পেটে তখন অনেক ক্ষুধা।

তো, হঠাৎ একটা মেয়ে এসে বলল, ‘মামা, যাবেন?’

আমি হঠাৎ বলে ফেলেছি, ‘জি, যাব।’

‘কোথায় যাবেন?’

উনি বললেন, ‘শান্তিনগর।’

আমি বললাম, ‘রাস্তা দেখিয়ে দিয়েন, আমি যেতে পারব। আমি নতুন মানুষ, চিনি না।’

উনি উঠলেন আমার রিকশায়। তারপর উনাকে খুব কষ্ট করে শান্তিনগর গিয়ে নামিয়ে দিলাম। রাস্তার সিগন্যালও ভালো করে বুঝতাম না। ভয়ে ভয়ে গিয়েছি।

উনি আমাকে ৫০ টাকা ভাড়া দিয়েছিলেন। তারপর রিকশা নিয়ে ফিরে এলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম, আর সম্ভব না। এই রিকশা আমি এখনই জমা দেব।

যেই কথা, সেই কাজ। গ্যারেজে রিকশা জমা দিলাম। পকেট থেকে আরও ৫০ টাকা যোগ করে মোট ১০০ টাকা গ্যারেজ ভাড়া দিলাম।

এরপর আমার বন্ধুকে রাতে বললাম, ‘তুমি আমার জন্য অনেক কষ্ট করেছ। আর করতে হবে না। তুমি আমার যেভাবে পারো, বাসায় পাঠিয়ে দাও। আমি খুব অসুস্থ। আমার পক্ষে আর এভাবে এখানে থাকা সম্ভব নয়।’

পরে সে আমাকে বাসায় ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিল।

ঢাকায় আমি মোটামুটি ১০ দিনের মতো ছিলাম। বাসায় আমি দিনাজপুর হয়েই গিয়েছি। কারণ, বাসার মানুষ যাতে বুঝতে না পারে যে, আমি এতদিন ঢাকায় ছিলাম। বাসায় এটা-সেটা বলে বুঝিয়েছি। কিন্তু মন খুলে সব কথা বলতে পারিনি।

বাসায় আসার ১ মাস পরে দিনাজপুর গিয়ে ওই মাদরাসা শিক্ষকের বাসা থেকে কম্পিউটার নিয়ে এসেছি। কিন্তু আমার কম্পিউটার আর অক্ষত ছিল না। একপ্রকার নষ্ট করেই ফেলেছিল।

বাড়িতে নিয়ে আসার পরে কোনো রকমে ৩ মাস ব্যবহার করেছিলাম। তারপর আমার মাদারবোর্ড অচল হয়ে গিয়েছিল।

পরে আমি শুনেছি, ওই মাদরাসা শিক্ষকের ২ ছেলে ছিল। তারা খুব ডানপিটে ও অভদ্র টাইপের। ওই দুই ছেলে নিজেরাই আমার কম্পিউটার সেট করে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করেছে।

যাই হোক, তাতে আমি তেমন দুঃখ পাইনি। কারন, ওটা যে আমার ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।

বাসায় আসার কিছুদিনের মধ্যে আমি সুস্থ হয়ে গিয়েছিলাম। বাসার পরিবেশ আর বাইরের ওই সব পরিবেশের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান ছিল। আমি বলব যে, আমি বেঁচে গিয়েছি। আমার আরও বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারত।

হেডলাইনে বলেছিলাম একটা ভুল সিদ্ধান্তের কথা। নিশ্চয়ই আপনারা এতক্ষণে বুঝে গিয়েছেন যে, আমি কত বড় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

মাদরাসা শিক্ষক আমাকে যেভাবে বলেছিলেন, সেটা আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু তিনি তো আমাকে মিথ্যা বলেছিলেন। তিনি যদি মিথ্যা না বলতেন, তাহলে আমার জীবন থেকে প্রায় ২টা মাস হারিয়ে যেত না। আমাকে এত কষ্ট পেতে হতো না।

নিজের সিদ্ধান্ত সবসময় নিজে নেবেন। অবশ্যই পরিবারের সহযোগিতা নেবেন, কিন্তু নিজের সবকিছু কারও ওপর ছেড়ে দেবেন না। জীবনটা একান্তই নিজের। সুতরাং নিজের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সবারই আছে।

সম্ভব হলে নিজে একটা স্টার্টআপ ব্যবসা শুরু করুন। দিনে ১০০ টাকা ইনকাম আসছে—আসুক। ধৈর্য ধরলে সেই ১০০ টাকা ৫০০ টাকায় রূপান্তরিত হতে সময় লাগবে না।

তবুও এরকম হুজুগে কোনো কাজ করবেন না। সবসময় সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। দ্রুত সিদ্ধান্ত সবসময় ভুল জায়গায় নিয়ে যায় বেশি।

মাথা ঠান্ডা তো আপনার সবকিছু ঠান্ডা।

কোনো বিষয়ে পজিটিভ ভাবার পাশাপাশি নেগেটিভ ইস্যু নিয়েও ভাববেন। মনে রাখবেন, যেখানেই বেশি সুখ, সেখানেই লুকিয়ে থাকে দুঃখ। বেশি লোভ করতে যাবেন না।

আর সবসময় সবকিছু পরিবারের সঙ্গে শেয়ার করবেন। আমি যদি আমার পরিবারের সঙ্গে পুরো বিষয় শেয়ার করতাম, তাহলে ঢাকায় এসে এমন বিড়ম্বনায় পড়তে হতো না।

পরিশেষে বলতে চাই, সিদ্ধান্ত নিতে ১০০ বার ভাবুন। সবসময় পরিবারের সঙ্গে সবকিছু শেয়ার করবেন। নিজের জীবন অন্যের কাছে বন্ধক রাখবেন না।

মন যা চায়, তাই করবেন। অল্পে তুষ্ট থাকবেন। নিজে কিছু করার চেষ্টা করবেন। জীবন সুন্দর হবে—অনেক সুন্দর। একটা ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে অনেকবার ভাবুন।

আমার মতো কোনো ফাঁদে পা দেবেন না। কারও কোনো অফার বিশ্বাস করার আগে অবশ্যই ভাববেন। জীবন সংক্ষিপ্ত—সংকীর্ণ নয়। কোনো সুযোগও হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে গ্রহণ করবেন না। সামান্য হলেও সময় নেবেন। মনে রাখবেন, একটা ভুল সিদ্ধান্ত আপনার মৃত্যুরও কারণ হতে পারে।

সবার জীবন সুখময় হোক—এই কামনায় ইতি টানলাম।

আরও পড়ুন: সেযুগ আর এযুগের ছেলেমেয়েদের মধ্যে পরিবর্তন কতটা ভয়াবহ!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top