দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে এগিয়ে আসছে সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল। তিনটি পৃথক বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা শেষে সরকার আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে বলে জানা গেছে। তবে একসঙ্গে পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়ন নয়, বরং ধাপে ধাপে এটি কার্যকর করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
কেন এই বিলম্ব? পটভূমি বোঝা দরকার
২০১৫ সালে অষ্টম পে-স্কেল ঘোষণার পর থেকে টানা ১১ বছর অতিবাহিত হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে দেশে মূল্যস্ফীতি লাগামহীনভাবে বেড়েছে, নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোয় কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার নবম পে-স্কেলের সুপারিশ প্রণয়নে জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই ওই কমিশন তাদের সুপারিশ জমা দেয়।
তিন কমিশনের সুপারিশ পুনর্গঠিত কমিটিতে
গত ২১ এপ্রিল সরকার পুনরায় একটি কমিটি গঠন করে, যেখানে তিনটি কমিশনের সুপারিশ একত্রিত করে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হচ্ছে। এই তিনটি কমিশন হলো:
১. জাতীয় বেতন কমিশন — সাধারণ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ২. জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন — বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের জন্য ৩. সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিশন — সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জন্য
সম্প্রতি এই পুনর্গঠিত কমিটি তাদের সম্মিলিত মতামত সরকারকে জানিয়েছে। মতামতে আর্থিক বাস্তবতাকে সামনে রেখে পর্যায়ক্রমে পে-স্কেল বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রথম ধাপে কী হবে?
অর্থ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ সূত্র জানিয়েছে, সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সবুজ সংকেত পাওয়া গেলে প্রথম ধাপে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন বৃদ্ধি করা হবে। এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সর্বাধিক প্রভাব বিস্তারকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ মূল বেতনের উপর ভিত্তি করে পরবর্তী সব ভাতা নির্ধারিত হয়।
দ্বিতীয় ধাপে কী থাকছে?
মূল বেতন বৃদ্ধির পর দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন ধরনের ভাতা পুনর্নির্ধারণ করা হবে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে চিকিৎসা ভাতা। পাশাপাশি বাড়িভাড়া ভাতা, যাতায়াত ভাতা, টিফিন ভাতা, ধোলাই ভাতা এবং ঝুঁকিভাতাসহ অন্যান্য আনুষাঙ্গিক ভাতাও ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে।
উল্লেখ্য, যাতায়াত ভাতা, টিফিন ভাতা ও ধোলাই ভাতা সাধারণত ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা পেয়ে থাকেন, যা নতুন কাঠামোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো: সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ কত?
কমিশনের সুপারিশকৃত নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী:
| বিবরণ | প্রস্তাবিত অঙ্ক |
|---|---|
| সর্বনিম্ন মূল বেতন | ২০,০০০ টাকা |
| সর্বোচ্চ মূল বেতন | ১,৬০,০০০ টাকা |
| সর্বনিম্ন-সর্বোচ্চ অনুপাত | ১:৮ |
লক্ষণীয় বিষয় হলো, ১৯৭৩ সালে প্রথম বেতন কমিশনে এই অনুপাত ছিল ১:১৫.৪ এবং ২০১৫ সালের ৮ম বেতন কমিশনে তা ছিল ১:৯.৪। বর্তমান প্রস্তাবে ১:৮ অনুপাত সুপারিশ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এর মানে হলো উচ্চ ও নিম্ন গ্রেডের মধ্যে আয়-বৈষম্য কমিয়ে আনার একটি ইতিবাচক প্রচেষ্টা।
নিম্ন গ্রেডের কর্মীরা কতটা লাভবান হবেন?
বর্তমানে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় কর্মরত ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন মাত্র ৮,২৫০ টাকা এবং সব ভাতা মিলিয়ে মোট প্রাপ্তি ১৬,৯৫০ টাকা।
নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে একই কর্মচারীর মূল বেতন হবে ২০,০০০ টাকা এবং সব ভাতাসহ মোট বেতন-ভাতা দাঁড়াবে ৪১,৯০৮ টাকায় — অর্থাৎ প্রায় আড়াইগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাবে।
উচ্চ গ্রেডে বৃদ্ধির হার কি কম থাকবে?
হ্যাঁ, ইচ্ছাকৃতভাবেই উচ্চ গ্রেডের (১ম থেকে ৯ম) কর্মকর্তাদের ভাতা বৃদ্ধির আনুপাতিক হার কম রাখা হয়েছে। এর পেছনে দুটি কারণ রয়েছে: প্রথমত, সামাজিক সমতা নিশ্চিত করা; দ্বিতীয়ত, ৫ম গ্রেড থেকে উচ্চতর পদে গাড়ি সেবা নগদায়ন ভাতার সুবিধা ইতিমধ্যে বিদ্যমান থাকায় আলাদা করে উল্লেখযোগ্য ভাতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা কম।
বিশেষ ভাতার কী হবে?
বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা ১০% এবং ১৫% বিশেষ ভাতা পান। নতুন বেতনস্কেল কার্যকর হওয়ার দিন থেকে এই বিশেষ ভাতাগুলো প্রচলিত নিয়মে সমন্বয় করার সুপারিশ করেছে কমিশন।
বাজেটে বরাদ্দ থাকবে কি?
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে চূড়ান্ত ঘোষণা নির্ভর করছে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের অনুমোদনের উপর।
সাধারণ চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা কোথায়?
দেশের লক্ষাধিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে নবম পে-স্কেলের অপেক্ষায় আছেন। বিশেষত নিম্ন গ্রেডের কর্মীরা, যারা সীমিত আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন, তারা মনে করছেন এটি তাদের জীবনমান উন্নয়নে একটি বড় ভূমিকা রাখবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন এখন আর স্বপ্ন নয়, বরং এটি সময়ের ব্যাপার মাত্র। ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের এই কৌশল সরকারের আর্থিক চাপ কমাবে এবং একই সাথে সরকারি কর্মচারীদের জীবনমানেও ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।
আরও পড়ুন: ৩৮০ উপজেলায় মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য: শিক্ষা ব্যবস্থায় গভীর সংকট
