৩৮০ উপজেলায় মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য: শিক্ষা ব্যবস্থায় গভীর সংকট

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পদ শূন্য

দেশের শিক্ষা প্রশাসনে এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশের মোট ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে বর্তমানে ৩৮০টি উপজেলায় মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য রয়েছে। অর্থাৎ দেশের প্রায় ৭৭ শতাংশ উপজেলায় মাধ্যমিক শিক্ষার তদারকির কোনো কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো নেই। এই সংকট শুধু একটি প্রশাসনিক শূন্যতা নয়, এটি মাঠ পর্যায়ে মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী বাধার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরের শেষ নাগাদ এই সংখ্যা ছিল ৩২৮টি উপজেলা। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে শূন্য পদের সংখ্যা আরও বেড়ে ৩৮০-তে পৌঁছেছে, যা পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার পদও শূন্য ২৮৯ উপজেলায়

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য থাকার পাশাপাশি সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদও ২৮৯টি উপজেলায় খালি রয়েছে। উল্লেখ্য, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কর্মচারী পদ থেকে ৮২ জনকে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এই পদোন্নতি না দেওয়া হলে শূন্য পদের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতো।

একটি উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষার সামগ্রিক কার্যক্রম পরিচালনা, তদারকি ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন মূলত উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং তাঁর সহকারী। এই দুটি পদ একযোগে শূন্য থাকলে শিক্ষা প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

একজনের কাঁধে দুই থেকে চার উপজেলার ভার

বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক এলাকায় মাত্র একজন কর্মকর্তাকে একাধিক উপজেলার সমস্ত দায়িত্ব একা সামলাতে হচ্ছে। নওগাঁ জেলার একজন সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে তাঁর নিজের উপজেলাসহ পাশের আরও চারটি উপজেলার কার্যক্রম দেখভাল করতে হচ্ছে। ভোলা, খুলনা, ফরিদপুর ও মাগুরাসহ একাধিক জেলায়ও একইভাবে একজন কর্মকর্তা দুই থেকে তিনটি উপজেলার দায়িত্বে রয়েছেন।

একজন কর্মকর্তার পক্ষে একাধিক উপজেলার স্কুল মনিটরিং, পরীক্ষা পরিচালনা, বই বিতরণ কার্যক্রম, উপবৃত্তি বাস্তবায়ন, এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া, বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপনসহ উপজেলা প্রশাসনের অসংখ্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা সম্ভব নয়। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত তদারকি একেবারেই হয় না বললেই চলে।

১৭ বছরের অবহেলায় তলানিতে মাধ্যমিক শিক্ষার মান

সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে মাধ্যমিক শিক্ষার মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক কাঠামোকে গুরুত্ব না দেওয়ার ফলে পুরো ব্যবস্থাটিই ভেঙে পড়েছে। এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়গুলো কোনো কার্যকর তদারকি ছাড়াই নিজেদের ইচ্ছামতো পরিচালিত হচ্ছে। নিয়মিত শ্রেণি পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রাইভেট টিউটরিং ও কোচিং সেন্টারের উপর শিক্ষার্থীদের নির্ভরতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। সামগ্রিকভাবে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার গুণগত মান এখন গভীর সংকটে।

৩০ বছর ধরে পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তারা

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা দীর্ঘ ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো পদোন্নতি পাননি। দশকের পর দশক একই পদে কাজ করতে করতে তাঁদের মধ্যে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ জমে উঠেছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কর্মক্ষেত্রেও।

২০১৮ সালে প্রকল্পে কর্মরত উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজাররা আদালতের দ্বারস্থ হন। সেসময় আদালত পদোন্নতির প্রক্রিয়ায় স্থিতাবস্থার আদেশ দেন, যা চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি তুলে নেওয়া হয়। ফলে এখন পদোন্নতির আর কোনো আইনি বাধা নেই।

পদোন্নতির উদ্যোগ: আশার আলো

বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন মাঠ পর্যায়ের শিক্ষা প্রশাসনের বেহাল দশা ও কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের হতাশা বিবেচনায় নিয়ে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের পদোন্নতির উদ্যোগ নিয়েছেন। এরই অংশ হিসেবে মাউশি অধিদপ্তর সম্প্রতি ১১৯ জন সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার জ্যেষ্ঠতার একটি খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার (গ্রেড-৯) শূন্য পদ পূরণের লক্ষ্যে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে।

মাউশির অফিস আদেশ অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা-২০২১ অনুযায়ী গ্রেড-১০ থেকে গ্রেড-৯-এ পদোন্নতির এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকাশিত খসড়া তালিকাটি ৩০ কর্মদিবস পর্যন্ত মাউশির ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত থাকবে। এই সময়ের মধ্যে কোনো আপত্তি, পর্যবেক্ষণ বা পরামর্শ থাকলে লিখিতভাবে অধিদপ্তরে জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, পদোন্নতির জন্য বিএড ডিগ্রি থাকা আবশ্যক। এই যোগ্যতা না থাকায় তালিকাভুক্ত অনেকেই পদোন্নতি পাবেন না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া ও প্রত্যাশা

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী, সচিব ও অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তাঁদের বিষয়ে ভাবছেন — এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, শুধু তালিকা প্রকাশেই সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পদোন্নতির কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর বক্তব্যে ফুটে ওঠে দীর্ঘ বঞ্চনার বেদনা — সন্তানরা জন্মের পর থেকে দেখছে, তাঁদের বাবা একই পদে চাকরি করছেন। অথচ এই পদোন্নতিতে সরকারের কোনো অতিরিক্ত আর্থিক চাপ নেই, কারণ পদোন্নতিটি একই বেতন কাঠামোর মধ্যেই হওয়ার কথা।

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও করণীয়

মাউশি অধিদপ্তরের সাধারণ প্রশাসন বিভাগের উপপরিচালক অধ্যাপক মো. শাহজাহান জানিয়েছেন, খসড়া তালিকার বিষয়ে মতামত সংগ্রহের পর চূড়ান্ত জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রস্তুত করা হবে। পরবর্তীতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদে পদোন্নতির প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এই তালিকায় সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষকরাও অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু পদোন্নতিই যথেষ্ট নয়। শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করতে হবে এবং মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশাসনকে একটি কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। তা না হলে মাঠ পর্যায়ে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের সব উদ্যোগই কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে।

সংক্ষেপে মূল তথ্য:

  • দেশের ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে ৩৮০টিতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য
  • ২৮৯টি উপজেলায় সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদও খালি
  • একজন কর্মকর্তাকে দুই থেকে চারটি উপজেলার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে
  • সহকারী কর্মকর্তারা ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পদোন্নতি পাননি
  • ১১৯ জনের জ্যেষ্ঠতার খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়েছে; মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা

আরও পড়ুন: এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের খবর ভিত্তিহীন ও গুজব — কড়া সতর্কবার্তা দিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top