জুলাই থেকে শিক্ষার্থীরা পাবে বিনামূল্যে স্কুলড্রেস, ব্যাগ ও জুতা — পাশে থাকছে বসুন্ধরা গ্রুপ

বিনামূল্যে স্কুলড্রেস ব্যাগ জুতা ২০২৬

বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। আগামী জুলাই ২০২৬ থেকে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ইবতেদায়ি মাদরাসার কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে পাবে স্কুলড্রেস, পাটের তৈরি স্কুলব্যাগ এবং জুতা। এই মহতী উদ্যোগকে বাস্তবে রূপ দিতে সরকারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপ

কেন এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশে এখনও অনেক নিম্নআয়ের পরিবারের শিশুরা শুধুমাত্র স্কুলড্রেস, ব্যাগ বা জুতার অভাবে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। একটি সম্পূর্ণ স্কুল ইউনিফর্ম কিনতে যে অর্থ লাগে, তা অনেক দরিদ্র পরিবারের কাছে বড় বোঝা। সেই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। সরকার ইতোমধ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যবই, মিড-ডে মিল এবং উপবৃত্তির মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন করার চেষ্টা করছে। এই নতুন কর্মসূচি সেই ধারাবাহিকতায় আরেকটি শক্তিশালী সংযোজন।

সচিবালয়ে উচ্চপর্যায়ের আন্ত মন্ত্রণালয় সভা

এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সম্প্রতি সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্ত মন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় উপস্থিত ছিলেন—

  • প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন
  • পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম
  • স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম
  • প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ
  • সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম
  • বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু
  • বিটিএমইএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল
  • সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবালের (এসবিজি) চেয়ারম্যান সাফওয়ান সোবহান

এই সভায় তিনটি মন্ত্রণালয় — শিক্ষা মন্ত্রণালয়, পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় — যৌথভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়।

পাইলট প্রকল্প দিয়ে শুরু, তারপর সারা দেশে

সভা শেষে শিক্ষামন্ত্রী জানান, প্রথম পর্যায়ে এটি একটি পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে নির্বাচিত উপজেলাগুলোতে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রতিটি উপজেলার দুটি করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হবে। ব্যবসায়ীদের সক্রিয় সহযোগিতায় পরবর্তী পর্যায়ে এই কর্মসূচি সারা দেশের প্রতিটি উপজেলায় ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে বিজিএমইএ পাইলট প্রজেক্টের জন্য এক লাখ ইউনিফর্মের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্য ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো তাদের কর্পোরেট পর্যায়ে আলোচনা করে শীঘ্রই সংখ্যা চূড়ান্ত করবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।

কোন শিক্ষার্থীরা পাবে এই সুবিধা?

প্রাথমিক পর্যায়ে এই কর্মসূচির সুবিধাভোগীরা হবে—

  • সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থী
  • ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা

পরবর্তী পর্যায়ে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদেরও এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। শিক্ষামন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, প্রথমে প্রাথমিক স্তর সম্পন্ন করে তারপর মাধ্যমিক স্তরে যাওয়া হবে।

পোশাক ও উপকরণ হবে অভিন্ন

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জানান, ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থীদের আলাদা আলাদা ডিজাইনের, তবে সারা দেশে একই রকম স্কুলড্রেস, স্কুলব্যাগ ও জুতা দেওয়া হবে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমতার অনুভূতি তৈরি হবে এবং বৈষম্য দূর হবে। পাটের তৈরি স্কুলব্যাগ ব্যবহারের সিদ্ধান্তটি পরিবেশবান্ধব এবং দেশীয় পাট শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি বুদ্ধিমান পদক্ষেপ।

বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতিশ্রুতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবালের (এসবিজি) চেয়ারম্যান সাফওয়ান সোবহান জানান, বসুন্ধরা গ্রুপ এই কর্মসূচিতে স্কুলব্যাগ এবং জুতা সরবরাহ করবে। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে বসুন্ধরা গ্রুপের পক্ষ থেকে ইলেকট্রিক স্কুলবাস দেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব যাতায়াত নিশ্চিত করবে।

বসুন্ধরা গ্রুপের এই এগিয়ে আসা দেশের কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (CSR) ক্ষেত্রে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে শিক্ষা খাতে এই বিনিয়োগ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ার ক্ষেত্রে একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ।

শিক্ষামন্ত্রীর আহ্বান: CSR-এ এগিয়ে আসুন

শিক্ষামন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলন ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলেন, দেশের শিক্ষা খাতকে এগিয়ে নিতে কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার আওতায় আরও বেশি উদ্যোক্তাকে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি ১৮০ দিনের শিক্ষা পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ব্যাগ ও ড্রেস বিতরণ হলো এই পরিকল্পনার প্রথম ও অন্যতম প্রধান কর্মসূচি।

বিটিএমইএর সমর্থন

বিটিএমইএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানান, বিজিএমইএ যে ঘোষণা দেবে, তার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বিটিএমইএও সমান সহযোগিতার হাত বাড়াবে। এটি স্পষ্ট করে যে দেশের বস্ত্র ও পোশাক শিল্পের প্রধান দুটি সংগঠন এই জাতীয় কর্মসূচিতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে প্রস্তুত।

সরকারের সক্ষমতা ও অংশীদারিত্বের দর্শন

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের সক্ষমতা সরকারের রয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী চান সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো একযোগে এই কাজে অংশ নিক। এই দৃষ্টিভঙ্গি আসলে রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ দায়িত্বের এক নতুন মডেল উপস্থাপন করে।

সামগ্রিক প্রভাব ও সম্ভাবনা

এই কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে—

  • ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমবে
  • বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার বাড়বে
  • দরিদ্র পরিবারের আর্থিক চাপ লাঘব হবে
  • দেশীয় পাট শিল্পের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে
  • কর্পোরেট-সরকার অংশীদারিত্বের একটি নতুন মানদণ্ড তৈরি হবে

জুলাই ২০২৬-এ এই পাইলট প্রজেক্টের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে।

আরও পড়ুন: প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে জট: দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিলেন প্রতিমন্ত্রী

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top