রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায় এক পপকর্ন বিক্রেতা দম্পতির উপর ভয়াবহ হামলার ঘটনা আলোচনার ঝড় তুলেছে। মঙ্গলবার গভীর রাতে সরদহ রেলস্টেশনে সংঘটিত এই ঘৃণ্য ঘটনায় নিরীহ স্বামীকে বেঁধে রেখে তার স্ত্রীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পরদিন বুধবার দুপুরে ভুক্তভোগী স্বামী চারঘাট মডেল থানায় আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করেছেন এবং পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে তৎপরতা শুরু করেছে।
ঘটনার পটভূমি: ট্রেনে পপকর্ন বিক্রি করে চলতো সংসার
নাটোর সদর উপজেলার হাশেমপুর গ্রামের এই দম্পতি দীর্ঘদিন ধরে ট্রেনে পপকর্ন বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন। প্রতিদিনের মতো মঙ্গলবার বিকালেও তারা বাড়ি থেকে বের হন এবং ঢাকা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী ‘ঢাকা মেইল’ ট্রেনে পপকর্ন বিক্রি শেষ করেন। রাত প্রায় একটার দিকে তারা সরদহ রেলস্টেশনে নামেন এবং স্টেশনসংলগ্ন একটি চায়ের দোকানে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন।
দিনের পরিশ্রমের পরে স্বাভাবিকভাবে বিস্কুট খেতে খেতে বিশ্রাম নেওয়া এই দম্পতি কল্পনাও করতে পারেননি যে রাতের অন্ধকারে তাদের জীবনে কোন ভয়াবহ পরিস্থিতি নেমে আসতে পারে।
হামলার বিবরণ: লাঠি ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে একা হামলা
পুলিশ ও ভুক্তভোগীর বিবরণ অনুযায়ী, রাত একটার দিকে আশরাফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি লাঠি ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে সরাসরি ওই দম্পতির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হামলাকারী প্রথমে স্বামীকে লাঠি দিয়ে নির্দয়ভাবে আঘাত করে আহত করে। এরপর আহত ও অসহায় স্বামীকে একটি পরিত্যক্ত দোকানের পাশে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে রাখে।
স্বামীকে অচল করে রাখার পর হামলাকারী সেই দিনের পপকর্ন বিক্রির সমস্ত টাকা ছিনিয়ে নেয়। তারপর নিরীহ ওই নারীকে জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে স্টেশনসংলগ্ন জঙ্গলে নিয়ে যায় এবং সেখানে তাকে ধর্ষণ করে।
উদ্ধারের বিবরণ: ৪৫ মিনিট আটকে থাকলেন বাঁধা অবস্থায়
ভুক্তভোগী স্বামী জানান, বাঁধা অবস্থায় তিনি বারবার চিৎকার করতে থাকেন। তবে রাতের গভীরতা ও জনশূন্য পরিবেশে সাহায্য পেতে প্রায় ৪৫ মিনিট লেগে যায়। অবশেষে আশপাশের লোকজন তার চিৎকার শুনে এগিয়ে আসেন এবং তাকে বন্ধন থেকে মুক্ত করেন। এরপর স্বামী ছুটে গিয়ে জঙ্গল থেকে তার স্ত্রীকে উদ্ধার করেন। উদ্ধার হওয়ার পর পরিবারটি ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয়
স্থানীয় সূত্র ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে জানা গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম আশরাফুল ইসলাম। তিনি চারঘাট উপজেলার হলিদাগাছী জাগিরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। এই মুহূর্তে তিনি পলাতক রয়েছেন বলে জানা গেছে।
স্টেশন মাস্টারের বক্তব্য
সরদহ স্টেশন মাস্টার ইকবাল কবির জানান, ঘটনার সময় রেলস্টেশনে মাত্র তিনজন স্টাফ কর্মরত ছিলেন। স্টেশনের একটু দূরে এই ঘটনা ঘটায় তারা তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হতে পারেননি। পরে বিষয়টি জানার পর যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য ও তদন্তের অগ্রগতি
চারঘাট মডেল থানার ওসি আব্দুল মালেক বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ভুক্তভোগী স্বামী বুধবার দুপুরে থানায় লিখিত মামলা দায়ের করেছেন এবং মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়েছে। অভিযুক্ত আশরাফুল ইসলামকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশি অভিযান ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। ভুক্তভোগী নারীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা ও আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মেডিকেল পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে বলেও জানা গেছে।
সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন
এই ঘটনা আবারও প্রত্যন্ত রেলস্টেশন ও গভীর রাতে নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষেরা, বিশেষত যারা ট্রেনে হকারি করে সংসার চালান, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েরই রয়েছে। প্রত্যন্ত স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় এ ধরনের ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
স্থানীয়রা দ্রুত বিচার ও দোষীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
সর্বশেষ পরিস্থিতি
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অভিযুক্ত আশরাফুল ইসলাম এখনও পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হননি। পুলিশ জানিয়েছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে এবং আইনি প্রক্রিয়ায় বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্র কি ইরান যুদ্ধে কৌশলগত ফাঁদে পড়েছে? জার্মান চ্যান্সেলরের কড়া সতর্কবার্তা
