বাংলাদেশ। নদীমাতৃক এই দেশটির নাম উচ্চারণ করলেই মনে ভেসে ওঠে সবুজ মাঠ, পাখির কলতান, পদ্মার ইলিশ আর মায়ের হাতের ভাতের থালা। কিন্তু এই মনোরম আবরণের আড়ালে যে নির্মম বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, তা কি আমরা কখনো সরাসরি মুখোমুখি হতে পারি? আজ সেই কথাই বলব — কোনো লেপ বা মলম ছাড়া, একেবারে খোলামেলাভাবে।
ফুটপাত: যেখানে হাঁটা মানেই মৃত্যুর সাথে লুকোচুরি
আপনি হয়তো ভাবছেন, ফুটপাত দিয়ে হাঁটা তো নিরাপদ। গাড়ির রাস্তা এড়িয়ে পথচারীর জন্য নির্ধারিত পথে হাঁটাই তো বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু এই দেশে সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে বারবার। অপরিকল্পিত নির্মাণাধীন ভবন থেকে নিক্ষিপ্ত একটি ইট নিমিষেই কেড়ে নিতে পারে আপনার প্রাণ। নিরাপত্তা জাল নেই, সাইনবোর্ড নেই, দায়িত্বশীল তদারকি নেই — আছে শুধু উদাসীনতার মহাসমুদ্র। ঢাকার পথে-প্রান্তরে রাজউক অনুমোদনহীন বহুতল ভবন গড়ে ওঠে রাতারাতি, অথচ ফুটপাতে হাঁটা নিরীহ মানুষটির মৃত্যুর কোনো বিচার হয় না।
রেস্টুরেন্ট: আনন্দের আসর যেখানে মুহূর্তেই হয়ে যায় শোকের মাতম
পরিবারের সাথে একটু আনন্দ করতে বেরিয়েছেন। হয়তো সন্তানের জন্মদিন, কিংবা বিবাহবার্ষিকী। টেবিলে খাবার আসার আগেই কানে আসে বিকট শব্দ — অননুমোদিত গ্যাস সংযোগের বিস্ফোরণ। মুহূর্তেই পারিবারিক আনন্দের মুহূর্তটি রূপান্তরিত হয় অকল্পনীয় বিভীষিকায়। বাংলাদেশে রেস্টুরেন্টে গ্যাস বিস্ফোরণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা, অবৈধ সংযোগ এবং নিম্নমানের পাইপলাইন — এই ত্রয়ীর মিলিত ফলই হলো প্রতিটি বিস্ফোরণ, প্রতিটি নিহত পরিবার।
সড়ক: নিয়ম মানলেও মৃত্যু অনিবার্য
নিয়ম মেনে গাড়ি চালাচ্ছেন, হেলমেট পরেছেন, সিটবেল্ট বেঁধেছেন — কিন্তু তাতে কী? ধনীর নেশাগ্রস্ত সন্তান যখন শত কোটি টাকার গাড়ি নিয়ে মধ্যরাতের রাস্তায় দৌড়ায়, তখন তার গতিপথে পড়া যেকোনো প্রাণই ঝরে যেতে পারে। আর এই দেশে সেই নেশাগ্রস্ত হত্যাকারীর বিচার হয়? না, হয় না। উকিল আসে, জামিন হয়, মামলা ঝুলে থাকে বছরের পর বছর। অর্থ আর ক্ষমতার কাছে জীবনের মূল্য এখানে তুচ্ছ।
প্রভাবশালীদের সাথে বিরোধ: পাথরেই পিষ্ট হয় সত্য
আপনার জমি দখল হয়েছে। আপনার বোনকে উত্ত্যক্ত করা হচ্ছে। আপনার অধিকার লুণ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিবাদ করতে গেলেন — কিন্তু প্রতিপক্ষ যদি হয় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কেউ? তাহলে কী হয়, তা এদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ জানেন। পাথর দিয়ে পিষে মারা, লাশের ওপর নৃত্য — এটা রূপকথা নয়, এটা বাংলাদেশের বাস্তব ইতিহাসে লেখা হয়ে গেছে। বিচার? সেটা যেন অন্য কোনো গ্রহের শব্দ।
মানবাধিকার ও গুম: আয়না ঘরের অন্ধকার
মানুষের অধিকারের কথা বলতে গেলে এই দেশে একসময় আয়না ঘরের ডাক আসত। নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মানুষের পরিবার বছরের পর বছর খোঁজে বেড়ায় — কোনো সংবাদ নেই, কোনো মৃতদেহ নেই, কোনো বিচার নেই। শুধু একটা শূন্যতা, যা প্রতিটি পরিবারের বুকে পাথরের মতো চেপে বসে। এই গুমের সংস্কৃতি কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সহিংসতার নাম নয় — এটি একটি সমাজের নৈতিক মৃত্যুরও স্মারক।
কারখানা শ্রমিক: স্বপ্নের সাথে মাটিচাপা পড়ে যায় জীবন
গ্রাম থেকে ঢাকায় আসা তরুণী মিতুর স্বপ্ন ছিল ছোট ভাইকে পড়াবে। গার্মেন্টসে কাজ করে তিল তিল করে সঞ্চয় করছিল। কিন্তু রানা প্লাজার মতো একের পর এক ভবন ধসে কত মিতু চাপা পড়ে গেছে, তার হিসাব কে রাখে? মালিক পালিয়ে যায়, রাষ্ট্র নিরব থাকে, বিদেশি ব্র্যান্ড আরেকটু সস্তায় অর্ডার দেয় — আর সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা নারীটির কথা আস্তে আস্তে ভুলে যায় সবাই।
নারী: যে দেশে অস্তিত্বই যন্ত্রণার
এই দেশে নারী হয়ে বেঁচে থাকা মানে প্রতিটি পদক্ষেপে সতর্ক থাকা। রাস্তায় বের হলে উত্ত্যক্তকারী, বাসে যৌন হয়রানি, অফিসে কর্তৃপক্ষের লোলুপ দৃষ্টি — এ যেন নারীর জন্মগত নিয়তি। ধর্ষণ? সেটাও এই দেশে এখন পরিসংখ্যানের বিষয় হয়ে গেছে। ন্যায়বিচার পাওয়া? সংখ্যাতীত প্রতিবন্ধকতার মুখে বেশিরভাগ মামলাই হারিয়ে যায় ফাইলের স্তূপে। যে নারী সাহস করে মামলা করে, সমাজ তাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।
শাসনব্যবস্থা ও নিপীড়ন: প্রশ্ন করলেই পরিণাম ভয়াবহ
রাষ্ট্রের অপশাসনের বিরুদ্ধে কলম ধরলে, মাইক্রোফোনে কথা বললে, সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিলে — পরিণাম কী হতে পারে তা এই দেশের অনেক সাহসী মানুষ জানেন। পরিবার কখনো মৃতদেহটিও পায় না। এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা কেবল একটি সরকারের ব্যর্থতা নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক অবক্ষয়ের ফলশ্রুতি।
ম্যানহোল: শিশুর মৃত্যু হয় সিটি কর্পোরেশনের অবহেলায়
সন্তান বাইরে খেলছে। আপনি ভাবছেন নিরাপদ পাড়ায় আছে। কিন্তু রাস্তার পাশে উন্মুক্ত ম্যানহোল? সিটি কর্পোরেশন জানে, কিন্তু ঢাকনা লাগানোর সময় নেই। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা — সর্বত্র শিশুরা এই মৃত্যুফাঁদে পড়ে প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা? না, নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়: পুকুরে ভাসে স্বপ্নের লাশ
সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পড়তে পাঠিয়েছিলেন সন্তানকে। বড় মানুষ হবে — ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কিংবা বিচারক। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের পুকুর থেকে সন্তানের নিথর দেহ উদ্ধার হলে সেই স্বপ্ন কোথায় যায়? র্যাগিং, সেশনজট, রাজনৈতিক দলীয়করণ — এই বিষবৃক্ষের ছায়ায় বেড়ে উঠতে গিয়ে কত মেধাবী তরুণের জীবন ঝরে গেছে, তার কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান কেউ রাখে না।
স্কুল: প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে কাড়ে শিশুর জীবন
সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা কোনটি? স্কুল। কিন্তু এই দেশে এমনও ঘটেছে যে স্কুলের উপর বিধ্বস্ত হয়েছে প্রশিক্ষণ বিমান। একটি নয়, একসাথে দুইশো শিশুর ভবিষ্যৎ নিমিষেই শেষ। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে এই দেশে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষমতা বা সদিচ্ছা — কোনোটিরই যেন অভাব নেই।
বিচার কি পাওয়া যায়?
এত কিছুর পরেও কি ন্যায়বিচারের আশা করা যায়? অনেকেই করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই দেশে বিচারের চাকা ঘোরে ধীরে — এত ধীরে যে, বাদী মারা যান, সাক্ষী মারা যান, মামলা চলতেই থাকে। আর যাদের অর্থ ও ক্ষমতা আছে, তারা এই ব্যবস্থাকে নিজেদের অনুকূলে ব্যবহার করতে পারদর্শী।
তবুও এটাই আমাদের বাংলাদেশ
এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলে অবস্থিত এই ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুর দেশটি মাছে-ভাতে বাঙালির বাংলাদেশ — একথা সত্য। কিন্তু এই সত্যের পাশাপাশি আরেকটি সত্যও লিখে রাখা দরকার: এটি সেই দেশ, যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজের অবহেলায়, দুর্নীতিতে, ক্ষমতার অপব্যবহারে সাধারণ মানুষের জীবন প্রতিদিন বিপন্ন।
পরিবর্তন সম্ভব। কিন্তু পরিবর্তনের জন্য দরকার জবাবদিহিতা, দরকার সচেতন নাগরিক, দরকার সাহসী কণ্ঠস্বর — যারা এই অব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিদিন প্রশ্ন তুলবেন, প্রতিবাদ করবেন।
বাংলাদেশকে ভালোবাসুন — কিন্তু তার ব্যর্থতাগুলো চোখ বন্ধ করে মেনে নেবেন না।
