নতুন হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি ইরানের

ইরানের হুঁশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্রকে হামলার জবাব হরমুজ প্রণালি

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি নতুন করে কোনো সামরিক আক্রমণ পরিচালনা করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে ‘দীর্ঘস্থায়ী ও অত্যন্ত বেদনাদায়ক’ পাল্টা আঘাত হানা হবে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে ইরান। শুধু তাই নয়, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে বলেও পুনরায় ঘোষণা করা হয়েছে। এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগের ঢেউ তুলেছে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ: বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কেন্দ্রে ইরান

বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে। এই সংকীর্ণ কিন্তু কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি বর্তমানে বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা অনিবার্য হয়ে পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে শুরু হওয়া এই সামরিক সংঘাত ইতোমধ্যে দুই মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। গত ৮ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি চললেও ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ছাড়েনি। ইরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, তাদের তেল রপ্তানিতে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত এই জলপথ উন্মুক্ত করা হবে না। ফলে যুদ্ধবিরতি কার্যত অসম্পূর্ণ এবং ভঙ্গুর পরিস্থিতির মধ্যেই আটকে আছে।

মার্কিন সামরিক পরিকল্পনা: আবারও যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে?

হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা গেছে, ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে চাপ প্রয়োগের উদ্দেশ্যে নতুন সামরিক অভিযানের একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সেই পরিকল্পনার বিষয়ে বৃহস্পতিবার বিশেষ ব্রিফিং করার কথা ছিল। পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এই প্রসঙ্গে মুখ না খুললেও কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে যে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে।

অন্যদিকে ঐ একই রাতে ইরানের রাজধানী তেহরানে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার শব্দ শুনতে পাওয়া গেছে বলে খবর মিলেছে। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা মেহর নিউজ নিশ্চিত করেছে যে ড্রোন এবং নজরদারি বিমান মোকাবেলায় দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়েছিল। ঘটনাটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মাত্রা কতটা তীব্র তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড ও সর্বোচ্চ নেতার কড়া বার্তা

ইরানের অভিজাত সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সরাসরি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি নতুন করে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত প্রতিটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ব্যাপক ও ভয়াবহ পাল্টা হামলা চালানো হবে। এই বিবৃতি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগের নতুন মেঘ তৈরি করেছে, বিশেষত যাদের সৈন্য ও ঘাঁটি সেই অঞ্চলে রয়েছে।

পাশাপাশি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় অত্যন্ত দৃঢ়ভাষায় জানিয়েছেন যে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌম কর্তৃত্ব কোনো অবস্থাতেই ছেড়ে দেওয়া হবে না। তার এই বক্তব্য কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে, যার মাধ্যমে ওয়াশিংটন এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি পুনরায় চালু করার চেষ্টা করছে।

কূটনৈতিক অচলাবস্থা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ

জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শন এবং আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। চীন ও রাশিয়াও এই সংকট নিরসনে কূটনৈতিক চ্যানেল খোলা রাখার পক্ষে মত দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে না চাওয়ায় এবং ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো ছাড় দিতে অনিচ্ছুক থাকায় আলোচনার পথ এখনো বন্ধই আছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার প্রতিটি দিন বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন ধাক্কা দিচ্ছে। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত তাদের তেল রপ্তানি চালিয়ে যেতে বিকল্প পথ খুঁজছে। কিন্তু সেসব বিকল্প পথে সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত এবং খরচও বহুগুণ বেশি।

ভবিষ্যতের পরিস্থিতি: যুদ্ধ না কূটনীতি?

বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে দুটি পথ খোলা আছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান পুনরায় চালালে মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণমাত্রার আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠবে, যার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। দ্বিতীয়ত, কূটনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটলে উভয় পক্ষকেই উল্লেখযোগ্য양ছাড় দিতে হবে, যা রাজনৈতিকভাবে উভয় দেশের জন্যই কঠিন।

ইরান ইতোমধ্যে স্পষ্ট করে দিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ছাড়া হরমুজ প্রণালি খোলা হবে না। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের এই অবস্থানকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যায়িত করেছে। ফলে আগামী কয়েক দিনের কূটনৈতিক তৎপরতা ও সামরিক সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে।

আরও পড়ুন: ভূমধ্যসাগরে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি: নৌকা বিকল হয়ে আট দিন ভাসার পর ১৭ অভিবাসীর মৃত্যু, নিখোঁজ আরও ৯

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top