বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রকোপ: দেড় মাসে ২৬৪ শিশুর প্রাণহানি, ৬১ জেলায় ছড়িয়েছে মরণব্যাধি

বাংলাদেশে হামের প্রকোপ ২০২৬

বাংলাদেশে হামের (Measles) সংক্রমণ এখন এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে। মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে দেশের ৬১টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে এই অতি সংক্রামক রোগ। এই সময়ের মধ্যে ২৬৪ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে, আর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ৩৩ হাজারেরও বেশি শিশু। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ইতিমধ্যে এই পরিস্থিতিকে জাতীয়ভাবে “উচ্চঝুঁকিপূর্ণ” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অথচ সরকারি তৎপরতা এখনো প্রত্যাশার তুলনায় অনেক পিছিয়ে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা: সংখ্যায় যা বলছে

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত—

  • ৩৩,৩৮৬ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে
  • ২২,৪৪২ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে
  • বর্তমানে তিন হাজার শিশু হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় চিকিৎসাধীন
  • ২৬৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাম ও হামের উপসর্গজনিত কারণে
  • সংক্রমণ ছড়িয়েছে দেশের ৬১টি জেলায়

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ঢাকায়। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬,৪০০ ছাড়িয়ে গেছে এবং সেখানে মৃত্যু হয়েছে ৬৬ জনের।

মৃত শিশুদের বয়স ও মৃত্যুর ধরন: উদ্বেগজনক চিত্র

মারা যাওয়া শিশুদের তথ্য বিশ্লেষণ করলে যে ছবি উঠে আসে তা অত্যন্ত মর্মান্তিক—

  • মৃত্যুর প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন শিশু হাসপাতালে ভর্তির মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মারা গেছে
  • ৪০ শতাংশ শিশু মৃত্যুবরণ করেছে ভর্তির ৭২ ঘণ্টার মধ্যে
  • বয়স বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মৃতদের ১৮ শতাংশের বয়স মাত্র ছয় মাসের কম
  • ৫০ শতাংশের বয়স ৭ থেকে ১০ মাসের মধ্যে
  • বাকি ৩২ শতাংশ এক বছরের বেশি বয়সী শিশু

ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এফ এ আসমা খান জানান, বেশিরভাগ শিশুই ঢাকার বাইরে থেকে একাধিক হাসপাতাল ঘুরে অবশেষে মুমূর্ষু অবস্থায় এখানে আসছে। প্রায় প্রতিটি শিশুর ক্ষেত্রেই হামের সঙ্গে মারাত্মক নিউমোনিয়া ও তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা যাচ্ছে। এদের মধ্যে ৯০ শতাংশ শিশু হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ায় জটিল অবস্থায় পৌঁছে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি ৩৩ শতাংশ ক্ষেত্রে মেনিনগোএনকেফালাইটিস এবং ২২ শতাংশ ক্ষেত্রে সেপটিসেমিয়া দেখা দিচ্ছে।

ডিএনসিসি হাসপাতালের পরিচালক কর্নেল ডা. লতিফা রহমান বলেন, আক্রান্ত শিশুদের বড় একটি অংশ অপুষ্টিতে ভুগছে। এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন রোগও পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে।

সংক্রমণ এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল কেন?

বিশেষজ্ঞরা এই দ্রুত বিস্তারের পেছনে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন:

১. টিকাদান কার্যক্রমে দীর্ঘ বিরতি: ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত কোনো নিয়মিত হাম-প্রতিরোধী টিকা ক্যাম্পেইন পরিচালিত হয়নি, যার ফলে একটি বড় অংশ শিশু অরক্ষিত অবস্থায় রয়ে গেছে।

২. নির্বাচন ও ঈদে ব্যাপক জনচলাচল: ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন এবং মার্চে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সারা দেশে লাখ লাখ মানুষের অবাধ যাতায়াত হয়েছে। এই জনচলাচলই মূলত সংক্রমণকে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় বহন করে নিয়ে গেছে।

৩. হামের স্বাভাবিক সংক্রমণ ক্ষমতা অত্যন্ত বেশি: হামের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার আগের তিন দিন পর্যন্ত আক্রান্ত শিশু বাইরে ঘুরে বেড়ায় এবং একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে।

৪. কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা: টিকার গুণমান বজায় রাখতে যে সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রয়োজন, তা সঠিকভাবে বজায় রাখা হচ্ছে না বলে বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করেছেন।

হাম শনাক্তে ভয়াবহ কিট-সংকট

রোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হলো দ্রুত শনাক্তকরণ। কিন্তু সেখানেই এখন সবচেয়ে বড় বাধা। বর্তমানে সারা দেশে কেবলমাত্র ঢাকার মহাখালীতে অবস্থিত জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (IEDCR) ল্যাবরেটরিতেই হামের পরীক্ষা হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মো. মোমিনুর রহমান জানিয়েছেন, তাদের দৈনিক ৩০০ থেকে ৪০০ নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা থাকলেও কিট-সংকটের কারণে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১২০টির মতো নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। WHO সরবরাহ করা প্রতিটি কিট দিয়ে প্রায় ৯০ জনের নমুনা পরীক্ষা করা যায়, অথচ সেদিন পর্যন্ত ল্যাবে মজুদ ছিল মাত্র ৫০টিরও কম কিট।

আরও হতাশাজনক বিষয় হলো, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কিছু কিট এসে পৌঁছালেও কাগজপত্রের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সেগুলো খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে জরুরি প্রয়োজনের সময়ে অতি প্রয়োজনীয় কিট গুদামে পড়ে নষ্ট হচ্ছে।

গত ১১ থেকে ১৮ এপ্রিল মাত্র আট দিনে ৯৬৫টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, যার মধ্যে ৬৪১টিতে হাম পজিটিভ এসেছে — অর্থাৎ পরীক্ষার ৬৬.৪ শতাংশ ক্ষেত্রেই হাম শনাক্ত হয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতার প্রমাণ।

WHO-র মূল্যায়ন ও বিশেষজ্ঞদের হুঁশিয়ারি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের বর্তমান হাম পরিস্থিতিকে জাতীয়ভাবে “উচ্চঝুঁকিপূর্ণ” বলে ঘোষণা করেছে এবং টিকার তীব্র ঘাটতি ও ক্রমবর্ধমান মৃত্যুহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, “WHO যখন কোনো অতি সংক্রামক রোগকে ‘উচ্চঝুঁকিপূর্ণ’ বলে, তখন সেটি কার্যত মহামারির সমতুল্য। এই পরিস্থিতিতে সরকারের অবিলম্বে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা উচিত ছিল, যাতে সঠিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনসচেতনতাও বাড়ানো যেত।”

জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো ‘মহামারি’ বা ‘আউটব্রেক’ শব্দটি ব্যবহারে অনীহা। তিনি বলেন, “জনগণকে আতঙ্কিত না করার অজুহাতে সরকার এই শব্দ এড়িয়ে চলছে, কিন্তু এর ফলে রোগ প্রতিরোধে সামাজিক সম্পৃক্ততা তৈরি হয়নি। মানুষ সতর্ক না হলে সংক্রমণ ঠেকানো যাবে না।”

মহামারি মোকাবেলায় কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি

বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, মহামারি ব্যবস্থাপনার যে মৌলিক ধাপগুলো এখনই বাস্তবায়ন করা জরুরি ছিল, তার বেশিরভাগই এখনো নেওয়া হয়নি:

  • বিজ্ঞানভিত্তিক ক্লিনিক্যাল প্রটোকল তৈরি করা হয়নি — ডেঙ্গু বা কোভিডের মতো একটি জাতীয় চিকিৎসা নির্দেশিকা থাকলে উপজেলা থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সকল হাসপাতালে একই মানের চিকিৎসা নিশ্চিত হতো
  • স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি — হাম ব্যবস্থাপনায় মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা কোনো বিশেষ ওরিয়েন্টেশন পাননি
  • আউটব্রেক ইনভেস্টিগেশন কমিটি গঠিত হয়নি — প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পরও কোনো তদন্ত কমিটি গঠিত হয়নি
  • ডেথ রিভিউ বা মৃত্যু কারণ বিশ্লেষণ নেই — কোথায় চিকিৎসার ঘাটতি হচ্ছে তা চিহ্নিত না করলে মৃত্যু কমানো সম্ভব নয়
  • জনসচেতনতামূলক প্রচারণা নেই — টিকা বিষয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা ও গুজব মোকাবেলায় কোনো কার্যকর মিডিয়া ক্যাম্পেইন পরিচালিত হচ্ছে না
  • মাইক্রো-প্ল্যানিং অনুপস্থিত — জেলাভিত্তিক সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া কেবল টিকা আমদানিতে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে

দেশে হামের ইতিহাস: বারবার ফিরে আসা দুঃস্বপ্ন

WHO-এর তথ্য বলছে, বাংলাদেশ একসময় হাম নির্মূলে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছিল। ২০০০ সালে প্রথম ডোজ টিকার কভারেজ ছিল ৮৯ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে ১১৮ শতাংশে পৌঁছায়। দ্বিতীয় ডোজ চালুর পর ২০১২ সালে ১২০ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ১২১ শতাংশে উন্নীত হয়।

তবুও বাংলাদেশ হামকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। ২০০৪-২০০৫ সালে বড় প্রাদুর্ভাব হয়েছিল — সেবার ২৫ হাজারের বেশি রোগী ছিল। ২০১১ ও ২০১৬ সালেও হামের প্রকোপ দেখা দেয়। এই পুনরাবৃত্তিই প্রমাণ করে, কাগজে-কলমে উচ্চ টিকা কভারেজ থাকলেই হাম নির্মূল সম্ভব নয় — প্রয়োজন সমন্বিত ও টেকসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা।

চিকিৎসক সমাজের দাবি: মহামারি ঘোষণা করুন এখনই

চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস প্ল্যাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ (DPPH) সরকারের কাছে অবিলম্বে হামকে ‘মহামারি’ ঘোষণা করে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের দাবিগুলো হলো:

১. উপজেলা থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত হাসপাতালগুলোকে শক্তিশালী করা ২. টিকা-বিরোধী গুজব ও ভুল তথ্য মোকাবেলায় কার্যকর জনসচেতনতা কার্যক্রম চালু করা ৩. শক্তিশালী ও বাস্তবমুখী রোগ নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা ৪. জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা

বিশেষজ্ঞরা এও বলছেন, ১২ এপ্রিলের যৌথ বিশেষজ্ঞ সভায় যেসব সুপারিশ করা হয়েছিল — যার মধ্যে বহুপক্ষীয় কমিটি গঠনও ছিল — সেগুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

করণীয়: এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার

হামের এই ভয়াবহ প্রকোপ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গভীর দুর্বলতাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। সরকার যদি এখনই সমন্বিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

দেশের প্রতিটি শিশুর জীবন রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তাই জরুরি অবস্থা ঘোষণা, দ্রুত কিট সরবরাহ নিশ্চিত করা, মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচারণা — এই চারটি পদক্ষেপ এখনই নেওয়া দরকার।

আরও পড়ুন: বিগত দুই সরকারের ব্যর্থতায় দেশে হামের প্রাদুর্ভাব: স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো সাখাওয়াত হোসেন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top