ফুটবলের মাঠে যিনি একসময় প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকাতেন দক্ষ দুই পায়ে, সেই মানুষটি আজ ব্যস্ত গাড়ির স্টিয়ারিং নিয়ে। না, এটি কোনো চলচ্চিত্রের গল্প নয়, এটি বাস্তব জীবনের এক অনন্য অধ্যায় — সাবেক ইতালিয়ান ফুটবলার ম্যাক্স টোনেত্তোর জীবনের গল্প।
বুট থেকে স্টিয়ারিং — অবিশ্বাস্য এক যাত্রা
এএস রোমা ও ইতালি জাতীয় দলের হয়ে খেলা এই প্রতিভাবান ডিফেন্ডারকে সম্প্রতি দেখা গেছে রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম উবারে যাত্রী পরিবহন করতে। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই ইতালি তথা ফুটবলবিশ্বে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। সাবেক এই ফুটবলার শুধু উবার চালাচ্ছেন তা-ই নয়, উবার অ্যাপে তার ঝুলিতে রয়েছে শত শত সম্পন্ন রাইড এবং একদম নিখুঁত, পূর্ণ রেটিং — যা তার দায়িত্বশীলতা ও পেশাদারিত্বের সুস্পষ্ট প্রমাণ।
আসল সত্য লুকিয়ে আছে পেছনে
তবে ব্যাপারটি যতটা সরল মনে হচ্ছে, ততটা সরল নয়। ইতালির প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম লা রিপাব্লিকা এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, টোনেত্তো কোনো আর্থিক সংকটে পড়ে উবার চালাচ্ছেন না। বরং এর পেছনে রয়েছে একটি সুচিন্তিত ও সুপরিকল্পিত ব্যবসায়িক কৌশল।
টোনেত্তো আসলে নিজস্ব শফার-চালিত গাড়ি ভাড়া সেবা (NCC — Noleggio con Conducente) চালু করতে চান। ইতালিতে এই ধরনের প্রিমিয়াম ড্রাইভার সার্ভিস পরিচালনা করতে হলে প্রয়োজন নির্দিষ্ট লাইসেন্স, সরকারি অনুমোদন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ — বাস্তব মাঠের অভিজ্ঞতা। সেই লক্ষ্যে তিনি নিজেই স্টিয়ারিং ধরে রাস্তায় নেমে পড়েছেন; শিখছেন, বুঝছেন, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছেন।
বিনম্রতার এক জীবন্ত উদাহরণ
যা সবচেয়ে বেশি মানুষের মনে দাগ কেটেছে তা হলো টোনেত্তোর নীরব কর্মনিষ্ঠা। বড় কোনো সংবাদ সম্মেলন নেই, চটকদার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট নেই — শুধু আছে নিজের স্বপ্নের দিকে মাথা নিচু করে হেঁটে যাওয়ার অদম্য মানসিকতা। তিনি একেবারে শূন্য থেকে শুরু করার সাহস দেখিয়েছেন, যেটা যেকোনো সাবেক তারকার জন্য মোটেই সহজ নয়।
এই মনোভাব তাকে আলাদা করে তুলেছে ফুটবল থেকে অবসর নেওয়া অনেক তারকার চেয়ে, যারা অনেক সময়ই অতীতের গৌরবে আটকে থাকেন।
ম্যাক্স টোনেত্তো: মাঠের ক্যারিয়ার যেমন ছিল
ম্যাক্স টোনেত্তো শুধু একজন সাধারণ ফুটবলার ছিলেন না। তার ক্যারিয়ার ছিল গৌরব ও সংগ্রামের সংমিশ্রণ। তিনি খেলেছেন ইতালির বেশ কিছু বিখ্যাত ক্লাবে —
- এএস রোমা — ইতালির অন্যতম সেরা ক্লাবে দীর্ঘদিন নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন
- ইউসি সাম্পদোরিয়া — সেরি আ-তে তার শক্তিশালী পারফরম্যান্সের আরেক পীঠস্থান
- ইউএস লেচ্চে — ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে এই ক্লাবেও তার অবদান উল্লেখযোগ্য
২০১০ সালে এএস রোমার সাথে চুক্তি নবায়ন না করে তিনি পেশাদার ফুটবলকে বিদায় জানান।
বিশ্বকাপজয়ী দলের একজন
টোনেত্তোর সবচেয়ে বড় গৌরবের মুহূর্তগুলোর একটি ছিল ইতালি জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানো। ২০০৭ সালে তিনি আজ্জুররি দলে ডাক পান — ঠিক এক বছর আগে যে দলটি জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ২০০৬ ফিফা বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাস তৈরি করেছিল। সেই বিশ্বকাপজয়ী দলের উত্তরসূরি হিসেবে জাতীয় দলে জায়গা পাওয়া নিজেই একটি বড় সাফল্য।
ব্যর্থতা নয়, এটি সাহসিকতা
অনেকেই হয়তো ভাববেন, একজন সাবেক আন্তর্জাতিক ফুটবলারের উবার চালানো মানে জীবনে পিছিয়ে পড়া। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা ও ভক্তরা এটিকে দেখছেন সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে। খেলোয়াড়ি জীবনের পর নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলা, একটি উদ্যোগকে সফল করতে নিজেই মাঠে নেমে পড়া — এটি আসলে একজন পরিপূর্ণ মানুষের আত্মবিশ্বাস ও বাস্তববাদিতার প্রতিচ্ছবি।
টোনেত্তো যেন আবারও প্রমাণ করলেন — একজন সত্যিকারের চ্যাম্পিয়ন মাঠে হোক বা রাস্তায়, সেরাটাই দিয়ে থাকেন।
আরও পড়ুন: ‘যুদ্ধে নামলে গুলি খাওয়ার ভয় করলে চলবে না’: পেসারদের ইনজুরি ও নাহিদ রানার অদম্য মানসিকতা
