বছরের শেষেই দেশে ফিরবেন সাকিব আল হাসান? স্বেচ্ছানির্বাসন শেষ করার আশা জানালেন নিজেই

সাকিব আল হাসান বাংলাদেশে ফেরা ২০২৬

বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে আলোচিত মুখ সাকিব আল হাসান। তিনি শুধু একজন ক্রিকেটার নন— তিনি একটি প্রজন্মের স্বপ্নের প্রতীক। কিন্তু রাজনীতির ঘূর্ণিপাকে পড়ে সেই কিংবদন্তি এখন নিজের দেশেই অনুপস্থিত। প্রায় দুই বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে থেকে প্রবাসজীবন কাটাচ্ছেন সাবেক এই টাইগার অধিনায়ক। তবে এবার নীরবতা ভেঙে নিজেই জানালেন— ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ মাতৃভূমিতে ফেরার দৃঢ় আশা রাখেন তিনি।

রাজনীতির মাঠে পা দিয়ে শুরু হয় বিপত্তি

২০২৩ সালের শেষ দিকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে মাগুরা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাকিব আল হাসান। ক্রিকেটের পাশাপাশি রাজনীতিতে এই যোগদান নিয়ে দেশজুড়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা হয়। তবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটলে পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে দেশে ফেরার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায় সাকিবের।

সেই থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন দেশের লিগে খেলেছেন, কিন্তু লাল-সবুজের জার্সিটা আর গায়ে চাপানো হয়নি। দেশের মাটিতে পা রাখতে পারেননি। এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি শুধু সাকিবের জন্য নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্যও এক অসহ্য শূন্যতার নাম।

স্পোর্টস্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আশার আলো

সম্প্রতি ভারতের বিখ্যাত ক্রীড়া গণমাধ্যম ‘স্পোর্টস্টার’-কে দেওয়া একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে মুখ খুললেন সাকিব আল হাসান। আগের মতো এড়িয়ে না গিয়ে এবার তিনি সরাসরি জানালেন মনের কথা।

সাকিব বলেন, “আমি আশাবাদী যে বছরের শেষ নাগাদ সবকিছুর সমাধান হয়ে যাবে। আপাতত আমি কেবল ভালো কিছুর প্রত্যাশা করছি। একটা বিষয় নিশ্চিত— আমাকে বাংলাদেশে ফিরতেই হবে। প্রশ্ন শুধু এটাই যে, তা কত দ্রুত সম্ভব। তবে আমি আশাবাদী যে বছরের শেষ নাগাদ আমি ফিরতে পারব। ঠিক কীভাবে তা ঘটবে আমি জানি না, তবে আমি সত্যিই আশাবাদী।”

তাঁর কথায় স্পষ্ট— পরিস্থিতি যতই জটিল হোক, দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা তাঁর মনের গভীরে এখনো অটুট। তিনি জানেন পথটা কঠিন, কিন্তু সেই পথ ধরেই হাঁটতে চান।

জাতীয় দলে ফেরার স্বপ্নও এখনো বাঁচিয়ে রেখেছেন

শুধু দেশে ফেরা নয়, সাকিব জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামার স্বপ্নটাও মনের কোণে লালন করছেন। তবে বাস্তবতা সম্পর্কে তিনি যথেষ্ট সচেতন। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন:

“বাংলাদেশের পরিস্থিতি যেকোনো সময় হঠাৎ বদলে যেতে পারে। আগামীকাল কী হবে, সেটা কেউই জানে না। তাই আমি এখনো আশাবাদী। আমি ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব বেশি ভাবি না। প্রতিদিন পরিবারকে নিয়ে নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। যখনই খেলার সুযোগ পাচ্ছি, সেটাকে কাজে লাগাচ্ছি। তবে জাতীয় দলে ফেরাটা আমার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেই। তবুও আমি একটা সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।”

এই কথাগুলো পড়লে বোঝা যায়, ভেতরে ভেতরে কতটা চাপ বহন করছেন এই মানুষটি। একদিকে পরিবার, অন্যদিকে ক্যারিয়ার, আর সবার উপরে দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার অনুভূতি— সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তিনি।

বিশ্বকাপে না খেলাকে “সাংঘাতিক ভুল” বললেন সাকিব

সাক্ষাৎকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে উঠে আসে সাম্প্রতিক টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ প্রসঙ্গ। ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করতে পারেনি, যা ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য বড় হতাশার বিষয়। এ নিয়ে সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানালেন সাকিব।

তিনি বলেন, “এটা অনেক বড় ক্ষতি। গোটা দেশ তাদের দলকে বিশ্বকাপে দেখতে ভালোবাসে। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলছে না, এটা বিগ মিস। এটা সেই সরকারের সাংঘাতিক ভুল ছিল।”

সাকিবের এই মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একজন সাবেক জাতীয় অধিনায়ক হিসেবে তিনি স্পষ্টভাবে দায় চিহ্নিত করলেন— এবং সেটি করতে দ্বিধা করলেন না।

প্রবাসে থেকেও থামেননি সাকিব

দেশে ফিরতে না পারলেও সাকিব কিন্তু ক্রিকেট থেকে সরে যাননি। বিভিন্ন দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলে নিজেকে সক্রিয় রাখছেন। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন, মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত রাখছেন। কারণ তিনি জানেন, দেশে ফেরার সুযোগ এলে প্রস্তুত না থাকলে চলবে না।

ক্যারিয়ারের এই সন্ধিক্ষণে সাকিব আল হাসানের প্রতিটি কথাই বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ ভক্তের কাছে এক গভীর আবেগের জায়গা ছর্ষ করে। তাঁর প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় দেশ, তাঁর ভক্তরা, এবং হয়তো বাংলাদেশ ক্রিকেট দলও।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে সাকিবের শূন্যতা কতটা?

সাকিব আল হাসানকে ছাড়া বাংলাদেশ ক্রিকেট কতটা অপূর্ণ, সেটা সংখ্যায় বলা কঠিন। টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি— তিন ফরম্যাটেই তাঁর অবদান অতুলনীয়। বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডারদের মধ্যে একজন হিসেবে বারবার নিজেকে প্রমাণ করা এই ক্রিকেটার আজও বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি।

তাঁর অনুপস্থিতিতে দলের মধ্যমাঠ দুর্বল হয়েছে, বোলিং আক্রমণে গভীরতা কমেছে, এবং সবচেয়ে বড় কথা— অভিজ্ঞতার একটা বিশাল অভাব তৈরি হয়েছে। তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য সাকিব শুধু একজন সতীর্থ নন, তিনি একটি জীবন্ত পাঠ্যপুস্তক।

সামনে কী?

২০২৬ সালের শেষ অর্থাৎ ডিসেম্বরের মধ্যে সাকিব দেশে ফিরতে পারবেন কিনা, সেটা নির্ভর করছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ, আইনি প্রক্রিয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তের উপর। এখন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে একটা বিষয় পরিষ্কার— সাকিব হাল ছাড়েননি। তিনি আশাবাদী, তিনি লড়াকু, এবং তিনি জানেন— বাংলাদেশই তাঁর ঘর।

কোটি ভক্তের সঙ্গে আমরাও অপেক্ষায় আছি— সেই দিনটির জন্য, যেদিন সাকিব আল হাসান আবার লাল-সবুজ জার্সি গায়ে মাঠে নামবেন, এবং ষ্টেডিয়াম কাঁপিয়ে জনতা গাইবে— “সাকিব! সাকিব!”

আরও পড়ুন: শান্তর সেঞ্চুরি ও মোস্তাফিজের ‘পাঞ্জা’: কিউইদের হারিয়ে সিরিজ জিতল বাংলাদেশ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top