ডিজিটাল শ্রমিকের নীরব লড়াই: মে দিবসেও যাঁদের অধিকার অধরা

ডিজিটাল শ্রমিকের অধিকার বাংলাদেশ

আজ মহান মে দিবস। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষ তাঁদের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্য পাওনার দাবিতে রাজপথে নামেন এই দিনে। কিন্তু এমন একটি শ্রেণি আছেন, যাঁরা প্রতিদিন ঘাম ঝরান, দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেন, অথচ কোনো শ্রমিক মিছিলে তাঁদের মুখ দেখা যায় না। কারণ তাঁরা কারখানার শ্রমিক নন, অফিসের কর্মকর্তাও নন। তাঁরা বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ ডিজিটাল শ্রমিক—ফ্রিল্যান্সার, রাইড শেয়ার চালক, ফুড ডেলিভারি রাইডার এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটর।

ল্যাপটপের স্ক্রিনের আলোয়, মোবাইল অ্যাপের নির্দেশে কাজ করা এই প্রজন্ম—প্রধানত জেনারেশন জি—আধুনিক অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠলেও বাংলাদেশের প্রচলিত শ্রম আইনের আওতার বাইরেই রয়ে গেছেন আজও।

কাজ আছে, কিন্তু “শ্রমিক” পরিচয় নেই

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার প্রত্যন্ত একটি গ্রামে বসে আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম ফাইভারে নিয়মিত কাজ করেন মো. ইমতিয়াজ হোসেন। তাঁর কোনো নির্দিষ্ট অফিস নেই, নেই কোনো নির্ধারিত কর্মঘণ্টা। ডিভাইস যেখানে, সেখানেই তাঁর কর্মক্ষেত্র। কিন্তু এই স্বাধীনতার পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর এক অনিশ্চয়তা।

ইমতিয়াজ বলেন, “বিদেশি ক্লায়েন্টের সাথে কাজ করতে গেলে প্রায়শই সারারাত জেগে থাকতে হয়। পরদিন সকালেও আবার কাজের টেবিলে বসতে হয়। কিন্তু অসুস্থ হলে বা কাজের অর্ডার না এলে আয় একদম বন্ধ। কোনো ছুটি নেই, কোনো বেতন নেই।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ এখন ফ্রিল্যান্সারদের অস্তিত্বের সংকট তৈরি করছে। ক্লায়েন্টের ছোটখাটো অনেক চাহিদাই এখন এআই দিয়ে মিটিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ফলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তির চেয়েও একধাপ এগিয়ে থাকতে হবে—এটি এখন ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বাধ্যতামূলক বাস্তবতা।

ঢাকার মিরপুরে থাকেন ২২ বছর বয়সী গ্রাফিক ডিজাইনার রাফি (ছদ্মনাম)। আপওয়ার্কে কাজ করেন তিনি। প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা স্ক্রিনের সামনে কাটে তাঁর। রাত জাগতে হয় বিদেশের সময়সীমা মেনে। তবুও শ্রমিক হিসেবে কোনো স্বীকৃতি নেই, কোনো নীতিমালা নেই।

রাফির কথায়, “আমরা দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা আনছি, অর্থনীতিতে অবদান রাখছি। অথচ আমাদের কথা বলার কোনো জায়গা নেই। কোনো অধিকার নেই।”

গিগ ইকোনমি: “পার্টনার” বলে ডাকা হয়, অধিকার দেওয়া হয় না

গিগ ইকোনমি বা স্বল্পমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক কাজের অর্থনীতি এখন বাংলাদেশে দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। উবার, পাঠাও, ফুড পান্ডার মতো রাইড-শেয়ারিং ও ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলোতে লাখো তরুণ প্রতিদিন জীবিকার সন্ধানে ছুটছেন। কিন্তু এই তরুণেরা কোম্পানির “পার্টনার”, কর্মচারী নন।

পুরান ঢাকার ওয়ারীতে ফুড ডেলিভারির কাজ করেন সাব্বির (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, “কোম্পানি আমাদের ‘পার্টনার’ ডাকে। কিন্তু অ্যাপ রেটিং কমে গেলে কাজ কমে যায়। রাস্তায় দুর্ঘটনা হলে চিকিৎসার খরচ নিজেকেই দিতে হয়। পার্টনারশিপটা শুধু নামে।”

গিগ ওয়ার্কারদের বৈশিষ্ট্য হলো, তাঁরা প্রথাগত কর্মসংস্থানের সুবিধা—যেমন প্রভিডেন্ট ফান্ড, স্বাস্থ্য বীমা বা চাকরির নিশ্চয়তা—পান না। কাজের একটা নমনীয়তা থাকলেও ঝুঁকি এবং অনিশ্চয়তা তাঁদের নিত্যসঙ্গী। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশের গিগ শ্রমিকদের বিশাল একটি অংশের কোনো সামাজিক নিরাপত্তা নেই, আয় অনিশ্চিত এবং কর্মঘণ্টা অস্বাভাবিক রকম দীর্ঘ।

সংখ্যায় বিশাল, সুরক্ষায় শূন্য

আইসিটি বিভাগ ও বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সার ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির (বিএফডিএস) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে সক্রিয় ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা আট লাখেরও বেশি। এঁদের মধ্যে সাড়ে ছয় লাখের বেশি আপওয়ার্ক, ফাইভার ও ফ্রিল্যান্সার ডটকমের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত। আইসিটি বিভাগের ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ফ্রিল্যান্সারদের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে—অর্থাৎ এটি মূলত তরুণ প্রজন্মের কর্মক্ষেত্র।

ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং মিলিয়ে প্রতি বছর বাংলাদেশে আসছে এক থেকে দেড় বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। এই হিসাবে ভারতের পরেই দক্ষিণ এশিয়ায় অনলাইন শ্রমের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস হলো বাংলাদেশ। এই ডিজিটাল শ্রমিকদের একটি অংশ এখন দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

অথচ এই বিশাল অর্থনৈতিক অবদানের বিপরীতে তাঁদের জন্য নেই কোনো ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তা, নেই স্বাস্থ্যসেবার সুরক্ষা, নেই অবসরকালীন কোনো সঞ্চয় পরিকল্পনা।

প্রচলিত শ্রম আইন: যুগের সাথে পাল্লা দিতে পারছে না

বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ মূলত কারখানা, প্রতিষ্ঠান ও প্রথাগত কর্মসংস্থানের কথা মাথায় রেখে প্রণীত। ফ্রিল্যান্সার বা গিগ ওয়ার্কারদের কথা এই আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। ফলে ডিজিটাল শ্রমিকেরা আইনি সুরক্ষার বাইরেই থেকে যাচ্ছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, “ডিজিটাল শ্রমবাজার অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বিস্তার লাভ করছে, কিন্তু আমাদের নীতিমালা সেই গতি ধরে রাখতে পারছে না। ফলে বিপুলসংখ্যক কর্মজীবী মানুষ অধিকারহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।”

তিনি আরও জানান, ফ্রিল্যান্সার বা অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার বা নিজেদের দাবি তুলে ধরার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মঞ্চ নেই। দুর্ঘটনা বা পেশাগত ঝুঁকির মুখে পড়লে সব দায়ভার তাঁদেরই বহন করতে হয়।

অধ্যাপক আকাশের মতে, সমাধান হলো ভারসাম্য তৈরি করা। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ যেমন ক্ষতিকর, তেমনি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীনতাও বিপজ্জনক। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয় খাতকে সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে তাদের মধ্যে একটি কার্যকর সম্পর্ক নির্ধারণ করতে হবে। অধিকার ও দায়িত্বের সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে হবে—কেউ যাতে বঞ্চিত না হন, আবার কেউ যাতে স্বেচ্ছাচারীও না হন।

বিশ্ব এগিয়েছে, বাংলাদেশ পিছিয়ে

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) তার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গিগ ইকোনমির শ্রমিকেরা সারা বিশ্বেই অনিশ্চিত কর্মপরিবেশ ও সীমিত সুরক্ষার সমস্যায় ভুগছেন। তবে অনেক দেশ এ বিষয়ে এগিয়ে গেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন গিগ কর্মীদের জন্য “শ্রমিকের মতো অধিকার” নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করেছে। ভারত ২০২০ সালের সামাজিক নিরাপত্তা কোডের মাধ্যমে গিগ ও প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তাঁদের জন্য সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা রেখেছে।

বাংলাদেশে এখনো বিষয়টি আলোচনার প্রাথমিক পর্যায়ে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গিগ ওয়ার্কারদের নিয়ে নীতিমালা তৈরির বিষয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। তবে এটি কবে বাস্তবে রূপ নেবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।

মানসিক স্বাস্থ্যের নীরব সংকট

ডিজিটাল শ্রমের আরেকটি অন্ধকার দিক হলো এর মানসিক প্রভাব। বিএফডিএসের তথ্য মতে, অনেক ফ্রিল্যান্সার প্রতিদিন ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত টানা কাজ করেন। একাকীত্ব, অনিশ্চিত আয়ের দুশ্চিন্তা এবং সার্বক্ষণিক পারফরম্যান্সের চাপ—এই তিন মিলে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে, অনিশ্চিত আয় এবং অসম প্রতিযোগিতার কারণে তরুণ ডিজিটাল শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও মানসিক চাপের হার বাড়ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, “ডিজিটাল পেশায় নিয়োজিত তরুণেরা সামাজিক সম্পর্ক থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। পারফরম্যান্সের ক্রমাগত চাপ মনোযোগ কমিয়ে দিচ্ছে, সামাজিক আচরণে সমস্যা তৈরি করছে। কনটেন্ট ক্রিয়েটররা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন।”

এর পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়া-প্রভাবিত “ভাইরাল হওয়ার” স্বপ্ন, ক্রিপ্টোকারেন্সি বা অনলাইন ট্রেডিংয়ে শর্টকাটে ধনী হওয়ার প্রলোভন—এসব তরুণদের দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা অর্জনের পথ থেকে সরিয়ে দিচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।

এগিয়ে যাওয়ার পথ কী?

বিশেষজ্ঞরা একমত যে, ডিজিটাল শ্রমিকদের স্বীকৃতি এখন আর শুধু নৈতিক দাবি নয়—এটি একটি অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা। নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:

১. আইনি স্বীকৃতি: শ্রম আইন সংশোধন করে ফ্রিল্যান্সার ও গিগ কর্মীদের আনুষ্ঠানিকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে।

২. ন্যূনতম সুরক্ষা: স্বাস্থ্য বীমা, দুর্ঘটনা ক্ষতিপূরণ এবং একটি সর্বনিম্ন আয়ের নিশ্চয়তার কাঠামো তৈরি করতে হবে।

৩. সংগঠনের অধিকার: ডিজিটাল শ্রমিকদের নিজেদের দাবি তুলে ধরার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম থাকতে হবে।

৪. প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন: সরকারি উদ্যোগে ডিজিটাল কর্মীদের জন্য নিয়মিত দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

৫. মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা: ফ্রিল্যান্সারদের মানসিক সুস্থতার জন্য বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে কাউন্সেলিং ও সহায়তা কার্যক্রম চালু করতে হবে।

উপসংহার: অদৃশ্য শ্রমিককে দৃশ্যমান করতে হবে

মে দিবসের মূল বার্তা হলো—প্রতিটি শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত হোক। কিন্তু ডিজিটাল যুগে শ্রমের সংজ্ঞা পাল্টে গেছে। যে তরুণ মধ্যরাতে ঘরে বসে বিদেশি ক্লায়েন্টের জন্য কাজ করছেন, যিনি রোদে পুড়ে খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন—তাঁরাও শ্রমিক। তাঁদের অধিকার, সুরক্ষা ও স্বীকৃতির দাবি উপেক্ষা করা মানে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারকে আরও বেশি অনিশ্চিত ও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া।

বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির এই অদৃশ্য মানুষগুলোকে দৃশ্যমান করার সময় এসেছে। আজকের মে দিবসে এটাই হোক সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি।

আরও পড়ুন: ঘণ্টায় ৬ ডলারের সাফাইকর্মী থেকে কোটি টাকার সাম্রাজ্য — মায়রন গোল্ডেনের অবিশ্বাস্য সাফল্যের গল্প

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top