ইসলামি শরিয়তে পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। আর এই পরিচ্ছন্নতার অন্যতম একটি মাধ্যম হলো মিসওয়াক। মিসওয়াক বা সিওয়াক শব্দটি আরবি ‘সাক’ শব্দমূল থেকে এসেছে, যার আভিধানিক অর্থ হলো ঘষা বা মর্দন করা। ইসলামি পরিভাষায়, দাঁত ও মাড়ির ময়লা পরিষ্কার করার উদ্দেশ্যে কোনো গাছের ডাল (বিশেষ করে পিলু বা নিমের ডাল) ব্যবহার করাকে মিসওয়াক বলা হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে মিসওয়াকের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। তিনি একে কেবল একটি অভ্যাস নয়, বরং ইবাদতের অংশ হিসেবে গণ্য করতেন। চলুন জেনে নিই মহানবী (সা.) কখন এবং কীভাবে মিসওয়াক করতেন।
১. ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর
রাসুল (সা.)-এর দিন শুরু হতো মিসওয়াকের মাধ্যমে। দীর্ঘ সময় ঘুমের কারণে মুখে যে জড়তা বা দুর্গন্ধ তৈরি হতো, তা দূর করতে তিনি প্রথমেই মিসওয়াক করতেন।
হুজায়ফা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন রাতে ঘুম থেকে উঠতেন, তখন মিসওয়াক দিয়ে নিজের মুখ পরিষ্কার করে নিতেন। (বুখারি, হাদিস : ২৪৫)
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, নবীজি (সা.) ঘুমানোর সময়ও মাথার পাশে মিসওয়াক রাখতেন যাতে জাগ্রত হয়েই তা ব্যবহার করতে পারেন।
২. ওজু ও সালাতের আগে
সালাত বা নামাজের আগে মিসওয়াক করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ কাজ। রাসুল (সা.) বলেছেন, যদি উম্মতের জন্য কষ্টকর না হতো, তবে তিনি প্রত্যেক নামাজের আগে মিসওয়াক করা বাধ্যতামূলক করে দিতেন। আম্মাজান আয়েশা (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) রাতে বিতর সালাতের জন্য ওঠার পর প্রথমে মিসওয়াক করতেন এবং তারপর ওজু করতেন। (মুসলিম, হাদিস : ৭৪৬)
৩. ঘরে প্রবেশের পর
বাইরে থেকে ঘরে ফিরে পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলার আগে মুখ সুগন্ধময় রাখা সুন্নাহ। আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রাসুল (সা.) ঘরে প্রবেশ করে সর্বপ্রথম কী কাজ করতেন? তিনি উত্তরে বলেন, “মিসওয়াক করতেন।” (আবু দাউদ, হাদিস : ৫১)
৪. জিহ্বা পরিষ্কার করার সময়
মিসওয়াক মানে কেবল দাঁত ঘষা নয়, বরং জিহ্বা পরিষ্কার করাও সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। আবু মুসা আশআরি (রা.) বলেন, একবার আমি নবী করিম (সা.)-এর কাছে প্রবেশ করলাম, তখন দেখলাম তিনি মিসওয়াকের এক প্রান্ত তাঁর জিহ্বার ওপর রেখে পরিষ্কার করছেন। (বুখারি, হাদিস : ২৪৪)
৫. মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে মহানবীর (সা.) শেষ আমল
নবীজি (সা.)-এর মিসওয়াকের প্রতি অনুরাগ এতটাই ছিল যে, জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগমুহূর্তেও তিনি মিসওয়াক করতে ভুলেননি। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, মৃত্যুর আগে যখন নবীজি অত্যন্ত অসুস্থ, তখন তাঁর ভাই আবদুর রহমান (রা.) হাতে একটি তাজা মিসওয়াক নিয়ে আসেন। নবীজি সেটির দিকে তাকালে আয়েশা (রা.) বুঝতে পারেন তিনি মিসওয়াক করতে চান। আয়েশা (রা.) নিজ দাঁত দিয়ে সেটি চিবিয়ে নরম করে দিলে নবীজি অত্যন্ত তৃপ্তির সাথে মিসওয়াক করেন। এটিই ছিল তাঁর জীবনের শেষ কাজগুলোর একটি।
উপসংহার
মিসওয়াক কেবল একটি প্রাচীন ঐতিহ্য নয়, বরং এটি একটি বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক আমল। এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যম এবং মুখের স্বাস্থ্যের জন্য মহৌষধ। তাই আমাদের উচিত প্রতিটি ওজু ও খাবারের পর এবং নবীজির নির্দেশিত সময়ে মিসওয়াক করার অভ্যাস গড়ে তোলা।
আরও পড়ুন: হজের সংক্ষিপ্ত গাইডলাইন: প্রস্তুতি থেকে বিদায়ী তাওয়াফ