রমজান মাসের অন্যতম বিশেষ আমল হলো তারাবির নামাজ। এই নামাজ মুসলমানদের জন্য একটি মহামূল্যবান ইবাদত, যা রাতের নীরব প্রহরে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। অনেকেই তারাবির সঠিক পদ্ধতি ও নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না। এই পোস্টে সহীহ সুন্নাহর আলোকে তারাবির নামাজের সম্পূর্ণ পদ্ধতি ধাপে ধাপে আলোচনা করা হয়েছে।
তারাবির নামাজ কী এবং কেন পড়বেন?
তারাবি আরবি “তারাওয়িহ” শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ বিশ্রাম নেওয়া। কারণ প্রতি চার রাকাত পর পর কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে পরবর্তী রাকাত শুরু করা হয়। এটি রমজান মাসের রাতে এশার ফরজ ও সুন্নাহ নামাজের পরে আদায় করা একটি বিশেষ নফল নামাজ, যা ইসলামের পরিভাষায় “কিয়ামুল লাইল” বা রাতের নামাজ নামেও পরিচিত।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজান মাসে রাতে কিয়াম করবে, তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।” (বুখারি ও মুসলিম)
এই হাদিসটি তারাবির নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
তারাবির নামাজ পড়ার সম্পূর্ণ নিয়ম (ধাপে ধাপে)
তারাবির নামাজ ২ রাকাত করে পড়তে হয়। মোট ৮ বা ২০ রাকাত পড়ার বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও উভয়ই সহীহ সূত্রে প্রমাণিত।
প্রথম রাকাত
১. নিয়ত করা তারাবির নামাজ শুরুর আগে অন্তরে নিয়ত করতে হবে। মুখে উচ্চারণ করা জরুরি নয়, তবে অনেকে বলেন:
“আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুই রাকাত তারাবির নামাজ পড়ছি।”
২. তাকবিরে তাহরিমা কিবলামুখী হয়ে সোজা দাঁড়ান। দুই হাত কান বরাবর উঠিয়ে বলুন:
আল্লাহু আকবার
এরপর বুকের উপর হাত বাঁধুন।
৩. সানা পাঠ
সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারাকাসমুকা ওয়া তা’আলা জাদ্দুকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুক।
৪. আউজুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়া
আউজুবিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বনির রাজিম। বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম।
এরপর সূরা আল-ফাতিহা সম্পূর্ণ পড়ুন, তারপর যেকোনো একটি সূরা বা কুরআনের আয়াত পড়ুন।
৫. রুকু
আল্লাহু আকবার বলে রুকুতে যান।
রুকুতে কমপক্ষে তিনবার পড়ুন:
সুবহানা রাব্বিয়াল আযীম
রুকু থেকে উঠে সোজা দাঁড়িয়ে বলুন:
সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ
এরপর বলুন:
রাব্বানা লাকাল হামদ
৬. প্রথম সিজদা
আল্লাহু আকবার বলে সিজদায় যান।
সিজদায় কমপক্ষে তিনবার পড়ুন:
সুবহানা রাব্বিয়াল আ’লা
৭. দুই সিজদার মাঝের বৈঠক সিজদা থেকে উঠে বসে পড়ুন:
আল্লাহুম্মাগ ফিরলি, ওয়ারহামনি, ওয়াহদিনি, ওয়া আ’ফিনি, ওয়ারযুক্বনি
৮. দ্বিতীয় সিজদা একই নিয়মে আবার সিজদা দিন।
দ্বিতীয় রাকাত
দ্বিতীয় রাকাতে দাঁড়িয়ে বিসমিল্লাহ বলে সূরা ফাতিহা পড়ুন, এরপর অন্য একটি সূরা পড়ুন। রুকু, সিজদা প্রথম রাকাতের মতোই করুন।
দ্বিতীয় সিজদার পর শেষ বৈঠকে বসুন এবং তাশাহহুদ পড়ুন:
আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াস-সালাওয়াতু ওয়াত-ত্বায়্যিবাতু। আস-সালামু আলাইকা আইয়্যুহান নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। আস-সালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিছ ছালিহীন। আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু।
এরপর দরুদ ইব্রাহিম পড়ুন:
আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিউ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিম, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিউ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা বারাকতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিম, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।
এরপর দোয়া মাসুরা পড়ুন:
আল্লাহুম্মা ইন্নি যালামতু নাফসি যুলমান কাছিরা ওয়া লা ইয়াগফিরুয-যুনুবা ইল্লা আনতা, ফাগফিরলি মাগফিরাতাম মিন ইন্দিকা ওয়ারহামনি, ইন্নাকা আনতাল গাফুরুর রাহিম।
সালাম ফেরানো: ডানে মাথা ঘুরিয়ে বলুন: আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ বামে মাথা ঘুরিয়েও একইভাবে সালাম দিন।
তারাবির সম্পূর্ণ কাঠামো
| পর্যায় | রাকাত সংখ্যা | বিবরণ |
|---|---|---|
| ১ম পর্যায় | ২ রাকাত | সালাম ফিরিয়ে সংক্ষিপ্ত বিশ্রাম |
| ২য় পর্যায় | ২ রাকাত | সালাম ফিরিয়ে সংক্ষিপ্ত বিশ্রাম |
| ৩য় পর্যায় | ২ রাকাত | সালাম ফিরিয়ে সংক্ষিপ্ত বিশ্রাম |
| ৪র্থ পর্যায় | ২ রাকাত | সালাম ফিরিয়ে সংক্ষিপ্ত বিশ্রাম |
| বিতর | ৩ রাকাত | তারাবির পর বিতর পড়া সুন্নাহ |
এভাবে মোট ৮ রাকাত (সহীহ হাদিস অনুযায়ী) অথবা ২০ রাকাত (হানাফি মতানুযায়ী) পড়ুন, তারপর ৩ রাকাত বিতর নামাজ আদায় করুন।
তারাবির পর বিতর নামাজ
তারাবির নামাজ শেষ হলে ৩ রাকাত বিতর নামাজ পড়া সুন্নাহ। বিতর নামাজের শেষ রাকাতে রুকুর আগে বা রুকু থেকে উঠে দোয়া কুনুত পড়তে হয়।
কিরাত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
ইমাম হিসেবে তারাবি পড়ালে দীর্ঘ কিরাত তিলাওয়াত করা সুন্নাহ। একাকী পড়লে নিজের সুবিধামতো ছোট বা মাঝারি সূরা পড়া যায়। রমজান মাসে পুরো কুরআন খতম করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ, তবে বাধ্যতামূলক নয়। যারা হাফেজ নন, তারাও পরিচিত সূরাগুলো দিয়ে নিয়মিতভাবে তারাবি আদায় করতে পারেন।
জামাতে তারাবি পড়ার ইতিহাস
রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজানে কয়েকটি রাত সাহাবাদের নিয়ে জামাতে তারাবি পড়েছিলেন। পরে তিনি নিয়মিত জামাত বন্ধ করে দেন এই আশঙ্কায় যে, উম্মত হয়তো মনে করবে এটি ফরজ হয়ে গেছে। পরবর্তীতে দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) উবাই ইবনে কা’ব (রা.)-কে ইমাম নিযুক্ত করে মুসলমানদের জন্য পুনরায় জামাতে তারাবির ব্যবস্থা চালু করেন, যা তিনি একটি “উত্তম বিদআত” বলে অভিহিত করেছিলেন অর্থাৎ পুরনো একটি সুন্নাহকে সংগঠিতভাবে পুনরুজ্জীবিত করা।
নারীদের জন্য তারাবি নামাজের বিধান
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে নারীদের জন্য ঘরে তারাবি আদায় করা উত্তম। তবে পর্দা ও শালীনতার সকল শর্ত মেনে মসজিদে জামাতে অংশগ্রহণ করাও বৈধ। অনেক বড় মসজিদে মহিলাদের জন্য আলাদা সুব্যবস্থা থাকায় সেখানে অংশ নেওয়া সম্ভব।
তারাবির নামাজে যে সুন্নাহগুলো মেনে চলবেন
✅ ধীরস্থিরভাবে পড়ুন — তাড়াহুড়া করলে নামাজের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। ✅ খুশু ও খুযু বজায় রাখুন — মনোযোগ সহকারে পড়ুন। ✅ প্রতিটি রুকন ধীরে আদায় করুন — দ্রুততার সাথে নামাজ পড়া মাকরুহ। ✅ শেষ দশকে বেশি ইবাদত করুন — লাইলাতুল কদরের অন্বেষণে রাত জেগে ইবাদত করুন। ✅ তারাবির আগে ও পরে নফল পড়ুন — অতিরিক্ত সওয়াব অর্জনের সুযোগ নিন।
তারাবিতে যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন
❌ অতিরিক্ত দ্রুততার সাথে নামাজ পড়া। ❌ রুকু-সিজদা ঠিকমতো না করা। ❌ জামাতে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকলেও একা পড়া (পুরুষদের ক্ষেত্রে)। ❌ নামাজে মোবাইল ফোন ব্যবহার করা। ❌ সানা বা তাশাহহুদ তাড়াতাড়ি শেষ করে ফেলা।
শেষ দশকে করণীয়
রমজানের শেষ দশ দিন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করতে হয়, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। রাসূলুল্লাহ (সা.) শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন এবং সারারাত ইবাদতে কাটাতেন। তারাবির পাশাপাশি তাহাজ্জুদ, জিকর, কুরআন তিলাওয়াত ও বিশেষ দোয়ায় মনোযোগ দিন।
তারাবির নামাজ কেবল একটি রাতের রুটিন নয়, এটি রমজানের আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সহীহ নিয়মে, মনোযোগ সহকারে এবং আল্লাহর ভালোবাসায় তারাবি আদায় করলে রমজানের পূর্ণ বরকত পাওয়া সম্ভব।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিকভাবে তারাবির নামাজ আদায় করার তওফিক দান করুন। আমিন।
আরও পড়ুন: মেসেজে ‘কবুল’ লিখলে কি বিয়ে হয়ে যায়? ইসলামি শরিয়াহ কী বলে জেনে নিন
