টঙ্গীর কেরানীরটেক মাদক বস্তিতে পুলিশি অভিযানে ব্যাপক সংঘর্ষ, আহত ৫ — আটক ৭

টঙ্গী কেরানীরটেক মাদক বস্তিতে পুলিশি অভিযান

গাজীপুরের টঙ্গীতে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার সময় পুলিশের ওপর সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাতে টঙ্গীর আমতলী কেরানীরটেক এলাকার কুখ্যাত মাদক বস্তিতে পরিচালিত এই অভিযানে মাদক কারবারিদের হামলায় চার পুলিশ সদস্যসহ মোট পাঁচজন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করতে হয় এবং সব মিলিয়ে সাতজনকে আটক করা হয়।

অভিযানের পটভূমি

দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুরের টঙ্গীর কেরানীরটেক এলাকার এই বস্তিটি মাদক কারবারের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। গোপন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি) এই অভিযানের পরিকল্পনা করে।

বুধবার রাত পৌনে দশটার দিকে সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. আছাবুর রহমানের নেতৃত্বে জিএমপির ডিবি (উত্তর ও দক্ষিণ) শাখার যৌথ দল উক্ত এলাকায় অভিযানে নামে। অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিলেন একাধিক মাদক মামলার পলাতক আসামি রুনা আক্তার ওরফে রুনা বেগম (৩৮) এবং তাঁর সহযোগীরা।

হামলার বিবরণ

পুলিশ দল রুনা আক্তারের বাসার সামনে পৌঁছানো মাত্রই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেখানে অবস্থানরত আসামিরা চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে এবং মুহূর্তের মধ্যে আশেপাশের লোকজনকে জড়ো করে ডিবি পুলিশের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা হত্যার উদ্দেশ্যে পুলিশ সদস্যদের মারধর করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম করে।

হামলায় আহত পুলিশ সদস্যরা হলেন — কনস্টেবল আরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল রাকিবুল ইসলাম, এএসআই নুরে আলম এবং নারী কনস্টেবল জাহানারা। আহতদের দ্রুত টঙ্গী শহিদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা প্রদান করা হয়।

সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ

পরিস্থিতি ক্রমশ হাতের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় এবং জানমাল ও সরকারি সম্পদ রক্ষার্থে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পুলিশ মোট চারটি সাউন্ড গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে হামলাকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং পালানোর চেষ্টা করে। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার এক পর্যায়ে পুলিশ সাতজনকে আটক করতে সক্ষম হয়। পলাতক আসামি রুনা আক্তারসহ আরও ১০-১২ জন অজ্ঞাতনামা আসামি দৌড়ে পালিয়ে যায়।

আটকদের পরিচয়

আটককৃত সাতজনের মধ্যে রয়েছেন — শাহীন আহমেদ রিজভী (৩৬), যিনি স্থানীয় যুবদলের কর্মী বলে জানা গেছে, এবং তাঁর স্ত্রী রওশন আরা (৩০)। এ ছাড়া আটক হয়েছেন সোহেল (২৮), রায়হান (১৯), সুমি আক্তার (২৪), নূরজাহান (৫৩) ও বিউটি আক্তার (৫৬)। আটকদের টঙ্গী পূর্ব থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে।

প্রেস ব্রিফিং ও মামলার প্রক্রিয়া

রাত সাড়ে বারোটার দিকে জিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. বেলায়েত হোসেন টঙ্গী পূর্ব থানায় একটি প্রেস ব্রিফিং করেন। তিনি জানান, মাদক কারবারিরা সুসংঘবদ্ধভাবে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলার জন্য মারাত্মক হুমকি। তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে এবং পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও প্রতিক্রিয়া

এই ধরনের মাদক বস্তিগুলো দীর্ঘদিন ধরে অপরাধের আখড়া হিসেবে কাজ করছে বলে স্থানীয়রা জানান। মাদক ব্যবসায়ীরা নিজেদের রক্ষার জন্য সংগঠিত হয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, এই ধরনের বস্তিগুলো নির্মূলে কেবল অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও সামাজিক কর্মসূচিও প্রয়োজন।

পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, কেরানীরটেক মাদক বস্তিসহ গাজীপুর জেলার সকল মাদক কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার বিষয়টিকে কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না বলে কর্তৃপক্ষ হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

আরও পড়ুন: রাজশাহীর চারঘাটে পপকর্ন বিক্রেতা দম্পতির উপর নৃশংস হামলা: স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top