কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা: ট্রাক-মাইক্রোবাস মুখোমুখি সংঘর্ষে শিশুসহ নিহত ৩, আহত ১১

কুড়িগ্রামে ট্রাক মাইক্রোবাস সংঘর্ষে নিহত

কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় একটি শিশুসহ মোট তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দিবাগত রাত পৌনে বারোটার দিকে উপজেলার বাঁশেরতল এলাকায় একটি পণ্যবাহী ট্রাক ও যাত্রীবাহী মাইক্রোবাসের মধ্যে প্রচণ্ড মুখোমুখি সংঘর্ষে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া দুর্ঘটনায় আরও অন্তত ১১ জন গুরুতর ও সামান্য আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের শারীরিক অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।

রংপুর থেকে ফেরার পথেই কাল হলো

জানা গেছে, দুর্ঘটনাকবলিত মাইক্রোবাসের সকল যাত্রী রংপুরে বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছে সেবা নিয়ে নিজ নিজ বাড়িতে ফেরার পথে ছিলেন। তারা ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বাসিন্দা। দীর্ঘ সফর শেষে বাড়ি ফেরার আনন্দ আর পূর্ণ হলো না তাদের — পথের মাঝেই নেমে এলো অন্ধকার। বিপরীত দিক থেকে ধেয়ে আসা একটি ভুট্টাবোঝাই ট্রাক হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাইক্রোবাসটিকে প্রচণ্ড গতিতে ধাক্কা দিলে মুহূর্তের মধ্যে দুটি যান একে অপরের সঙ্গে ভয়ঙ্করভাবে মিশে যায়। সংঘর্ষের ধাক্কায় মাইক্রোবাসটি পুরোপুরি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই তিনজন প্রাণ হারান।

নিহতদের পরিচয়

দুর্ঘটনায় যে তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। নিহতরা হলেন—

  • মোছা. ছাদিয়া (৮): ভূরুঙ্গামারী উপজেলার আসাদমোড় উত্তর তিলাই এলাকার মো. মনির হোসেনের কোলের আট বছর বয়সী কন্যাশিশু।
  • মো. নুরনবী (২৮): একই উপজেলার মো. জাহিদুল ইসলামের পুত্র।
  • মো. লিমন (২৮): ধলডাঙ্গা গ্রামের মো. সাইফুর রহমানের ছেলে এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে দুর্ঘটনার শিকার মাইক্রোবাসটিরই চালক।

নিহতদের মধ্যে দুইজন তরুণ পুরুষ এবং একজন নিষ্পাপ শিশু রয়েছে, যা এলাকায় শোকের ছায়া ফেলেছে।

আহতদের অবস্থা ও পরিচয়

দুর্ঘটনায় আহত ১১ জনের মধ্যে চারজন নারী ও একজন শিশু রয়েছেন বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। আহতদের মধ্যে যাদের পরিচয় এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হয়েছে তারা হলেন—আব্দুল গফুরের ছেলে হামিদুল ইসলাম, আব্দুস ছাত্তারের মেয়ে শান্তা, সোহরাব আলীর ছেলে সমের আলী এবং মো. জয়নালের মেয়ে মোছা. জবা। বাকি আহতদের পরিচয় শনাক্তকরণের কাজ চলছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং গুরুতর আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা

দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দা বেলাল হোসেন জানান, মাইক্রোবাসটি ভূরুঙ্গামারীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় বিপরীত দিক থেকে দ্রুতগতিতে আসা ভুট্টা বোঝাই ট্রাকটি হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি মাইক্রোবাসে আঘাত করে। ভয়াবহ সেই ধাক্কার শব্দ দূর থেকেও শোনা গেছে বলে তিনি জানান। সংঘর্ষের পরপরই স্থানীয়রা ছুটে এসে আহতদের উদ্ধারে হাত লাগান এবং দ্রুত জরুরি সেবা ডাকা হয়।

পুলিশের বক্তব্য ও তদন্ত

নাগেশ্বরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ হিল জামান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ভূরুঙ্গামারী বাসস্ট্যান্ড এলাকা অতিক্রম করার সময় মাইক্রোবাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। দুর্ঘটনার পরপরই ট্রাকের চালক ও তার সহকারী ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ায় এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তবে পলাতক চালককে গ্রেফতারের জন্য পুলিশ সক্রিয়ভাবে অভিযান পরিচালনা করছে বলে তিনি জানান। ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

বেপরোয়া গতি ও রাতের সড়কে ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাতের বেলা মহাসড়কে ভারী যানবাহনের বেপরোয়া গতি এবং চালকদের অসতর্কতা সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। এই ধরনের দুর্ঘটনায় বারবার নিরীহ যাত্রীরা প্রাণ হারাচ্ছেন। কুড়িগ্রামসহ উত্তরাঞ্চলের সড়কগুলোতে রাতের বেলা পণ্যবাহী ট্রাক চলাচলের সময় যথাযথ নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

নিহত শিশু ছাদিয়াসহ তিনটি পরিবার আজ শোকে পাথর। এলাকায় নেমে এসেছে বেদনার ছায়া। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে দ্রুত দোষীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

আরও পড়ুন: ফরিদপুরে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড: মানসিক ভারসাম্যহীন যুবকের কোদালের আঘাতে প্রাণ গেল তিনজনের

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top