ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র: এক ব্যয়বহুল যুদ্ধের মুখে ওয়াশিংটন

ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ ব্যয় ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তা কেবল সামরিক শক্তির লড়াই নয়, বরং এটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান ও ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা দেশটির আধুনিক ইতিহাসে বিরল। ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ—এই যুদ্ধের শেষ কোথায় এবং এর চড়া মূল্য কে চোকাবে?

যুদ্ধের আকাশচুম্বী ব্যয়: প্রতিদিন শত কোটি ডলারের ধাক্কা

পেন্টাগন এখন পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানের সঠিক খরচের হিসাব প্রকাশ না করলেও, মার্কিন সংবাদমাধ্যম ও কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদিনের ব্যয় ১০০ থেকে ২০০ কোটি ডলারে গিয়ে ঠেকছে।

Center for Strategic and International Studies (CSIS)-এর একটি বিশ্লেষণ বলছে, যুদ্ধের মাত্র প্রথম ১০০ ঘণ্টাতেই ওয়াশিংটন প্রায় ৩৭০ কোটি ডলার খরচ করে ফেলেছে। এই বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে ব্যবহৃত গোলাবারুদ এবং অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম প্রতিস্থাপনে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্কের ঝড়

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সামরিক পদক্ষেপ দেশের অভ্যন্তরে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। হাউস মাইনরিটি লিডার হাকিম জেফ্রিস সরাসরি প্রশাসনের সমালোচনা করে বলেছেন:

“যখন সাধারণ আমেরিকানরা স্বাস্থ্যসেবা এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, তখন প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি অন্তহীন যুদ্ধে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার উড়িয়ে দিচ্ছে।”

অন্যদিকে, হাউস বাজেট কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট ব্রেন্ডন বয়েল এই যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, এই সংঘাত জ্বালানির বাজারে কী প্রভাব ফেলবে এবং একই সময়ে যদি চীন বা অন্য কোনো অঞ্চলে উত্তেজনা দেখা দেয়, তবে তা মোকাবিলা করার সক্ষমতা পেন্টাগনের থাকবে কি না।

সামরিক সরঞ্জামের সংকট ও ইন্টারসেপ্টর মিসাইল

এই যুদ্ধের অন্যতম বড় উদ্বেগের জায়গা হলো যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া মজুত। ইরানের ড্রোন এবং মিসাইল হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র যে ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করছে, তার প্রতিটির দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার।

বর্তমানে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি আকাশচুম্বী:

  • ১২০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান: যার মধ্যে রয়েছে F-35 Lightning II এবং F-22 Raptor।

  • দুটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ: যা পরিচালনা করতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও জনবল প্রয়োজন।

  • কার্গো বিমান ও লজিস্টিকস: যা সরাসরি সামরিক বাজেটের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।

পেন্টাগনের পরবর্তী পদক্ষেপ ও অনিশ্চয়তা

প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইতিমধ্যে সতর্ক করেছেন যে, আগামীতে ইরানে হামলার তীব্রতা আরও বাড়তে পারে। পেন্টাগন হারিয়ে যাওয়া অস্ত্র ও সরঞ্জাম পুনর্সংগ্রহের জন্য প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের একটি সম্পূরক বাজেট প্রস্তাব তৈরি করেছে।

তবে প্রশ্ন হলো, আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতি আর বাজেট ঘাটতির এই সময়ে মার্কিন কংগ্রেস কি এই বিশাল অংকের অর্থ অনুমোদন দেবে? বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধের ব্যয় এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত আসন্ন মার্কিন নির্বাচনে একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াতে পারে।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সমীকরণ: মুজতবা খামেনির পাশে থাকার ঘোষণা পুতিনের

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top