জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি: দ্বিতীয় দিনেও পাম্পে দীর্ঘ সারি, সংকট কি ব্যবস্থাপনার?

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি

দেশের জ্বালানি খাতের অস্থিরতা যেন কাটছেই না। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে তেলের দাম বাড়ানোর দ্বিতীয় দিনেও রাজধানীসহ সারা দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভোগান্তির সেই চিরচেনা চিত্র দেখা গেছে। বর্ধিত মূল্যে তেল কিনতে হলেও পাম্পগুলোতে গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইন ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে রেশনিং, ফুয়েল কার্ড এবং ট্যাগ অফিসার নিয়োগের মতো নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হলেও মাঠ পর্যায়ে এর সুফল মিলছে না। ভুক্তভোগী ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংকটের মূলে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা।

দফায় দফায় উদ্যোগ, তবুও কাটছে না অস্থিরতা

জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবিলায় সরকার শুরু থেকেই বেশ কিছু কৌশল গ্রহণ করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—তেল বিক্রিতে রেশনিং পদ্ধতি চালু, ডিজিটাল ফুয়েল কার্ড প্রবর্তন, সরকারি অফিসের কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনা এবং তদারকির জন্য বিশেষ ট্যাগ অফিসার নিয়োগ। এমনকি সংকটের এই সময়ে তেলের ওপর বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এতসব উদ্যোগের পরও পাম্পগুলোতে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। বরং দাম বৃদ্ধির পর জনজীবনে অস্থিরতা ও নাভিশ্বাস আরও বেড়েছে।

তেলের বাজারে অস্থিরতার পটভূমি

গত মার্চ মাসের শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এর প্রভাবে ৫ই মার্চ থেকে ঢাকার অনেক পাম্পে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ৮ই মার্চ থেকে রেশনিং পদ্ধতি শুরু হলেও রমজান ও ঈদের সময় ব্যাপক চাহিদার কারণে সরকার তা শিথিল করতে বাধ্য হয়। মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সরবরাহ ১০ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হলেও মাঠ পর্যায়ে এর কোনো প্রতিফলন ঘটেনি।

অফিসের সময়সূচি পরিবর্তন ও নিরাপত্তা জোরদার

জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের পক্ষ থেকে অফিস ও ব্যাংক লেনদেনের সময়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে। বর্তমান সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সরকারি অফিস চলছে। অন্যদিকে, তেলের ডিপো ও ফিলিং স্টেশনগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। তবে নিরাপত্তা জোরদার হলেও তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরেনি।

ডিজিটাল ফুয়েল কার্ড ও ট্যাগ অফিসারের ভূমিকা

সঠিক বণ্টন নিশ্চিত করতে সরকার ‘ফুয়েল পাস’ বা কিউআর কোড ভিত্তিক ডিজিটাল কার্ড চালু করেছে। শুরুতে ঢাকার কয়েকটি পাম্পে এটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু হলেও বর্তমানে এটি বিস্তৃত করা হচ্ছে। প্রতিটি যানের জন্য আলাদা কোড থাকলেও কারিগরি ত্রুটির কারণে অনেক সময় গ্রাহকদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। অন্যদিকে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিটি পাম্পের জন্য একজন করে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যারা প্রতিদিনের তদারকি প্রতিবেদন প্রদান করেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই প্রশাসনিক কঠোরতার পরও কেন সরবরাহ স্বাভাবিক হচ্ছে না?

দাম বৃদ্ধি ও বিশেষজ্ঞ মতামদ

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারের সাথে সমন্বয় করতে এবং ভর্তুকির চাপ কমাতে সরকার অনেকটা বাধ্য হয়েই তেলের দাম বাড়িয়েছে। আশা করা হয়েছিল দাম বাড়লে মজুদ প্রবণতা কমবে এবং লাইন ছোট হবে। কিন্তু চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।

বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল এ বিষয়ে বলেন, “দাম বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহ বাড়ানো জরুরি ছিল। সরকার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে রাখায় তেলের সংকট কাটছে না। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে এক সপ্তাহের মধ্যে লাইন কমে আসত।”

অন্যদিকে, ক্যাব-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম মনে করেন, সরকারের কাছে যদি পর্যাপ্ত মজুত থাকে, তবে বিতরণে অবশ্যই গলদ আছে। ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণেই হয়তো সরকার ধীরে চলো নীতি অবলম্বন করছে।

উপসংহার

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি কেবল যাতায়াত খরচ বাড়ায় না, বরং এর প্রভাব পড়ে নিত্যপণ্যের বাজারেও। সাধারণ মানুষ একদিকে চড়া দাম দিচ্ছে, অন্যদিকে পাম্পে দাঁড়িয়ে কর্মঘণ্টা নষ্ট করছে। এই দ্বিমুখী সংকট থেকে উত্তরণে কেবল প্রশাসনিক আদেশ নয়, বরং তেল আমদানির দীর্ঘমেয়াদী নিশ্চয়তা এবং বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা এখন সময়ের দাবি।

আরও পড়ুন: বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব: মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় গ্রাহক ভাগ্য

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top